Featured রঙ্গের দুনিয়া

আহা বৈশাখ, পহেলা বৈশাখ

প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ একটি কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়ে কৃষকেরা কিংবা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত সকল শ্রেনীর মানুষেরা নানাভাবে বঞ্চনার স্বীকার হতো। তারই জের ধরে বিভিন্ন কৃষি পণ্যের জন্য জমিদার বা ক্ষমতার কেন্দ্রকে খাজনা প্রদান করতে হতো।
ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে ফসল বিক্রির আগেই অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে করতে হত।
এই বিশৃংখলা এড়াতে এবং খাজনা যেন সুষ্ঠুভাবে আদায় হয়- সে উদ্দেশ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি ‘সৌর সন এবং আরবি হিজরী সন’ এর উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন।
১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। যদিও এখন কৃষকদের আর খাজনা প্রদান করতে হয়না, তবে প্রাচীন এক প্রথা এখনও পালিত হয়ে আছে এই দিনকে ঘিরে। আর তা হলো হালখাতা।
সম্রাট আকবরের সময়ে এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। বিশেষত স্বর্ণের দোকানগুলোতে এই প্রথা এখনও প্রচলিত আছে।
তবে আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সনের পূর্বে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয় নি। কিন্তু বর্তমানে বাঙ্গালিয়ানা বজায় রাখতে এই এক দিনই পালিত হয় বেশ ঘটা করে।
বাংলা দিনপঞ্জীর সাথে হিজরী এবং খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এ কারণে হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় আকাশে নতুন চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার পর আর খ্রিস্টীয় সনে নতুন দিন শুর হয় ইউটিসি±০০:০০ অনুযায়ী।
কিন্তু পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু না সূর্যোদয় থেকে শুরু এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে। তাই দুটো সময়ের যেকোনো একসময়ে ফেসবুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালে আপনি বা অন্য কেউ ভুল না।
আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন? আমাদের দেশে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ১৫ই এপ্রিল। অর্থাৎ উৎসব এক হলেও উৎযাপনের দিন কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন।
পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যেসকল আয়োজন আমরা দেখতে পাই-
মঙ্গল শোভাযাত্রা
বর্তমানে বাংলাদেশে আমরা বর্ষবরণের অন্যতম আকর্ষণ চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে এই আয়োজন পালিত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে ‘ইউনেস্কো’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা করে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা
রমনার বটমূল
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি কিন্তু বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ।
রমনার বটমূল
জব্বারের বলীখেলা
জব্বারের বলীখেলা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা, যা চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে প্রতিবছরের ১২ই বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়।এই খেলায় অংশগ্রহনকারীদেরকে বলা হয় বলী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি বলীখেলা নামে পরিচিত। ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এই প্রতিযোগিতা জব্বারের বলী খেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। এই বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদিঘী ময়দানের আশে পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী মেলা।
জব্বারের বলীখেলা
বউমেলা এবং ঘোড়া মেলা
ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে যার নাম বউমেলা, এটি স্থানীয়ভাবে “বটতলার মেলা” নামেও পরিচিত। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে।
মাটির ঘোড়া
এ ছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে। সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে।
পান্তা-ইলিশ খাওয়া এবং লাল-সাদা পোশাল পরিধান
পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন এই বর্ষবরণকে ঘিরে পালিত হয়ে আসছে এমন নয়। যদিও এই খাবারের প্রচলন কিভাবে এসেছে তা নিয়ে লোকমুখে পার্থক্য পাওয়া যায়। তবে প্রাচীনকালে যখন কৃষকদের খাজনা আদায়ের জন্য নতুন বাংলা বছর নির্ধারণ করা হয়, তখনকার সামাজিক পরিবেশে কৃষকেরা ছিলেন অনেক দরিদ্র। সেই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে তখনকার দিনে কৃষকদের নিত্যদিনের খাবারই ছিল পান্তা ভাত। আর মাছে-ভাতে বাঙালি বলে যেহেতু আমরা পরিচিত তাই ইলিশ মাছ তখন সোনার হরিণ ছিল না তা ই বলা চলে।
লাল সাদা পোশাক পরিধানের বিষয়েও মতের অমিল আছে। তবে অধিকাংশের মতে প্রাচীনকালে রঙ্গিন কাপড়ের চল ছিলনা বলে সাদা কাপড়ের প্রাধান্যই বেশি ছিল। সেই থেকে লাল-সাদা পোশাক পরার প্রচলন শুরু হয়েছে।
পান্তা-ইলিশ
তবে যত যাই হোক, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব পালনের মাধ্যমেই আমাদের ঐতিহ্য লালিত হয়। তবে মতভেদে যদি কোনো উৎযাপন আপনার পছন্দ না হয় তবে সেই নির্দিষ্ট দিক এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। কেননা বছরের এই বিশেষ দিন একসাথে পালন না করলেও পক্ষান্তরে বছরের বাকি দিনগুলোতে আমরা ঠিকই মিলেমিশে একসাথে বসবাস করি। তাই বিভক্তির চিঁর কখনো যেন জাতীয় জীবনে আঘাত না হানে সেটিই যেকোনো জাতীয় উৎসবের মূল লক্ষ্য।
  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.