Featured আমেরিকা ভ্রমণ যুক্তরাষ্ট্র

আমেরিকা ২০১৭; ওয়াশিংটনে প্রথম সকাল

শেয়ার করুন

সকাল ৯টা ৫০ এর মধ্যে হোটেলের লবিতে থাকতে হবে, এটা রাতেই বলে দেয়া হয়েছে। দুইদিন না ঘুমানোয় সকালে উঠতে পারবো সে বিশ্বাস ছিলো না। তাই দুইটা মোবাইল আর হোটেলের টেবিল ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাত দুইটার দিকে ঘুমোতে গেলাম। বাংলাদেশে তখন দুপুর ২টা। যাই সকালে ওঠা নিয়ে বেশি দু:শ্চিন্তার কারণে কি না জানি না, ভোর ৬ টায় ঘুম ভেঙে গেলো।

এতক্ষণ কি করা যায়, ভাবতে ভাবতে যতটুকু পারা যায় শীতবস্ত্র পড়ে রেডি হয়ে গেলাম। কারণ আমি জানি একটা নতুন জায়গাকে নিজের মতো করে দেখতে হলে, প্রচুর হাটা ছাড়া ভালো কোন উপায় নেই। আর এবার তো আমার একেবারে ভোর বা সন্ধ্যার পর ছাড়া অন্য কোন সময় নেই। সারাদিন নানান অফিসিয়াল কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে।

হোটেল থেকে বেরিয়ে মনে হলো, ওয়াশিংটন শহরের ঘুম ভাঙেনি এখনো। কানের মধ্যে ইয়ারফোন গুজে দৌড়ানো শুরু করলাম। কারণ, নিচে নেমেই বুঝতে পেরেছি শীত ঠেকাতে আমার যে প্রস্তুতি তা যথেষ্ট নয়। তাই শীতকে পাত্তা দিতে না চাইলে দৌড়াতে হবে। হোটেল থেকে একটু বামে গিয়ে তারপর ডানের রাস্তা ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম।

রাস্তায় তখন অনেকক্ষণ পর পর একটা দুইটা করে গাড়ি চলছে। কিছুদূর যাবার পরেই ডানপাশে দেখলাম জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি। যে কোন বড় ইউনিভার্সিটি দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। এটা আমার পুরনো রোগ। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি আমেরিকার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান না চার্চ এর মাধ্যমে তৈরি হয়নি। সেই সময় আসলে সবকিছুই তৈরি হতো চার্চের মাধ্যমে। ইতিহাসের আরো অনেক কিছুতেই প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়।

এ ব্যাপারে নিজে জেনে পরে আবার লিখবো আশা করি। বিশ্ববিদ্যালয় হাতের ডানে রেখে সোজা রাস্তা ধরেই দৌড়াচ্ছি। একটু পর পর রাস্তার মোড় আর ছোট ছোট পার্ক। পার্কের বেঞ্চগুলো দেখলেই একটু বসে থাকতে ইচ্ছে করে। এই দেশগুলোতে শীতকালে গাছে পাতা থাকে না। দেখলে মনে হয়, এই শীতটা পার করতে পারে কি না!

এতক্ষণ জোরে জোরে হাটা আর দৌড়ানোর কারণে মনে হতে লাগলো এই শীত কোন ব্যাপার না। মাথা থেকে ক্যাপ খুললাম প্রথমে, তারপর হাতের গ্লাভস। রাস্তার চিহ্নগুলো খুব করে দেখে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আর ফাকা রাস্তায়ও হেটে পার হওয়ার সিগনাল না থাকলে পার হচ্ছি না। আমরা বাংলাদেশীরা আবার বিদেশে গেলে খুব নিয়ম মেনে চলি।

বেশ কিছুদূর যাবার পর একটা বড় রাস্তা পাওয়া গেলো। সেই রাস্তা পার হলেই বড় একটা পার্ক। পার্কের ভেতরে দেখলাম যুদ্ধের স্মারকের মতো মুর্তি বানিয়ে রাখা। আরেক পাশে বিশেষভাবে একটা রাস্তা তৈরি করা। সাথে একটা শৈল্পিক দেয়াল।

ভিয়েতনামের যুদ্ধে যাদের জীবন গেছে তাদের নাম লেখা দেয়ালের গায়ে। এর ডিজাইনার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন। যুদ্ধে নিহতদের নাম লেখা দেয়ালে তাকালে নিজের চেহারা দেখা যায়। সব মানুষই যে সমান সেটাই নাকি বুঝানো হয়েছে এর মাধ্যমে।

এটা আসলে সে অর্থে পার্ক নয়। ওয়াশিংটনকে বলা হয় ‘সিটি অফ মনুমেন্টস’। এই জায়গাটা আসলে তারই অংশ। মিনিট খানেক হেটে সামনে এগোলেই লিংকন মেমোরিয়াল। অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেই দেখা গেলো প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ভেতরে বসে আছেন যথারীতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার খবর তিনি জানেন কি না কে জানে!

লিংকন মেমোরিয়াল।

এটার ঠিক বিপরীত দিকেই বিশাল বড় একটা স্তম্ভ। সেটা ‘ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল’। এই স্তম্ভ দেখেই ওয়াশিংটন শহরকে চেনা যায়। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন আর প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এর স্মরণে এই দুই স্থাপনার মাঝখানে বড় একটা লেক এর মতো আছে। ওয়াশিংটন ডিসি শুধুমাত্র মনুমেন্টস এর শহর তো নয়, প্রেসিডেন্টদের শহরও তো বটে।

ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল এর দিকে না গিয়ে, লিংকন মেমোরিয়ালের উপর থেকে দেখলাম পাশেই একটা নদী। এবার নদীর কাছে যাই। এতক্ষণে শহরটা আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে শুরু করেছে। পার্কের ভেতরে দৌড়াতে আসা মানুষ যেমন বেড়েছে, রাস্তায় গাড়ির চলাচলও বেড়েছে।

পোটোমাক নদী।

এবার নদীর কাছে যাওয়া শুরু করলাম। কাছে গিয়েই দেখি অনেকগুলো হাঁস আরামে বসে আছে পানির মধ্যে। তাদের কেউ কেউ আবার একটু পর পর ঊড়াল দিয়ে আকাশ থেকে ঘুরে আসছে। ছবি তুলতে তুলতে একটু হাসি পেলো। কারণ, আমার স্ত্রীর ধারণা- আমার বিদেশ যাওয়া মানে লেক বা নদী দেখতে যাওয়া আর হাঁসের ছবি তোলা।

একটু দূরেই নদীর উপর একটা ব্রিজ। এই নদীর নাম ‘পোটোমাক’। এই নদী দিয়েই দুটি স্টেটের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। নদীর এপারে ডিস্ট্রিক্ট অফ কলম্বিয়া স্টেটের ওয়াশিংটন ডিসি আর ওপারে ভার্জিনিয়া স্টেট।

নদী, হাঁস আর ব্রিজের দিক থেকে ফিরে তাকাতেই দেখি লেখা আছে ‘ওয়েলকাম টু পোটোমাক পার্ক’। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। অনেকদূরে চলে এসেছি, ফিরতেও অনেকটা সময় লাগবে। দ্রুত হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম। সেই একই পথ। অন্য পথে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাই না। কারণ ৯:৫০ এর মধ্যে রেডি হয়ে হোটেলের লবিতে থাকতে হবে।

  • মুঞ্জুরুল করিম, সম্পাদক, প্রবাস কথা।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.