Featured ভ্রমণ

আমার বিদেশ ভ্রমণ ও ভুল থেকে শিক্ষা; পর্ব ০২

২০১৫ সালের মার্চের দিকে লম্বা একটা সফরে বের হলাম। যথারীতি প্রিয় জায়গা ইউরোপ। ৪০ দিনের ভ্রমণ। প্রথম ২০ দিন ঘুরবো ইউরোপের পথে প্রান্তরে, তারপরের ২০ দিন আমেরিকায়।

যাত্রা শুরু হলো ইতালীর রাজধানী রোম থেকে। বিমানবন্দরে নামার পর থেকে সার্বক্ষণিক সঙ্গী বন্ধু লিটন। রোম থেকে আমরা গেলাম নেপলস এর দিকে। সেখানে সরেন্টো নামের একটা অসাধারণ জায়গায় রাত কাটালাম। শহরটা দূর্দান্ত। আমি নাম দিয়েছিলাম ‘বাতাসের শহর’। ভূমধ্যসাগরের ঢেউ এসে প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়ে এর পায়ের কাছে। আর সেই ঢেউ এর সাথে বাতাসও আসে।

সরেন্টো থেকে মাউন্ট ভিস্যুভিয়াস দেখা যায়। আমরা আরেকদিন বের হয়ে মাউন্ট ভিস্যুভিয়াসও দেখে এলাম। এরপর মিলান, মানিয়াগো, ভেনিস চষে বেড়ালাম। একদিন আল-আমিন আর মাহিনদের সাথে সুইজারল্যান্ড। তারপর উড়াল দিলাম ডেনমার্কে। মাঝে দু’দিন থেকে এসেছি হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদাপেস্টে। বুদাপেস্টের মাঝখান থেকে বয়ে যাওয়া নদী দানিয়ুবের কাছে আমার মন পড়ে ছিল সেই ছোটবেলা থেকে।

মাত্র ২০ দিনে এতগুলো জায়গায় যাওয়া মানে অবিরাম ছুটে চলা। প্রায়ই এমন হতো যে, আমরা দৌড়ে গিয়ে প্লেনে উঠতাম। কোন কোন জায়গায় খাবার হাতে নিয়েই ছুটতে হতো। এভাবে ২০ দিন চোখের পলকেই চলে গেলো। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লো। আমি কফি খাওয়ায় আসক্ত হয়ে পড়লাম। এমন অবস্থায় আমেরিকায় যেতে আর মন চাইছিল না। কিন্তু যেতে হবে। কারণ, আমার ৫ বছরের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এত বছরের ভিসা একবারও যাইনি।

ইতালীতে ঘুরতে ঘুরতে কফির পাশাপাশি বিভিন্ন রং এর ফুলের প্রেমে পড়লাম। ভাবলাম, কিছু ফুলের বীজ দেশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। বীজের দোকানে গিয়ে প্যাকেটজাত কিছু বীজও কেনা হলো। তারপর আমেরিকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়ার পালা।

ইউরোপের সীমানা পেরিয়ে বিশাল সমুদ্রের উপর দিয়ে যাচ্ছে বিমান। ঘুমোতেও ক্লান্ত লাগছে। নিচে তাকিয়ে দেখি, আবার ঘুমিয়ে পড়ি। একটা সময় মানচিত্রে নিউ ইয়র্কের মাটি দেখা গেলো। বিমানের ক্রুরা ‘বোর্ডিং কার্ড’ বিতরণ শুরু করলেন। আমি সেটা পূরণ করতে শুরু করলাম।

একটা জায়গায় গিয়ে থমকে গেলাম। মনে হলো- এই সেড়েছে! ফরমের একটা জায়গায় লেখা আছে- ‘আপনি কোন বীজ বহন করছেন কি না?’

এই কথাতেই পরিষ্কার যে, কোন কিছুর বীজ নিয়ে আপনি আমেরিকায় ঢুকতে পারবেন না। এখন কি করবো? ব্যাপক চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমেরিকায় মনে হয় ঢোকা হলো না। সেখানে একটা জায়গায় লেখা আছে- বীজ বহন করলে ঘোষণা তো দিতেই হবে, তারপর সিদ্ধান্ত কি হবে তা কাস্টমস কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নেবেন।

ভাবছি আর ভাবছি। একবার লিখতে গিয়ে আবার ফিরে আসছি। থেমে যাচ্ছি। এই টেনশনের সময়টাতে মনে হয় বিমান দ্রুত যেতে শুরু করলো। নিউ ইয়র্কের আকাশ পৌঁছে গিয়েছি। তখন একটা সিদ্ধান্ত নিলাম- কপালে যা আছে হবে, এই ঘর পূরণ করবো না।

ঘরটা ফাঁকা রেখেই বিমান থেকে নামলাম। আগে শুনেছি জেএফকে এয়ারপোর্ট খুব ব্যস্ত থাকে। হাজার হাজার মানুষ ল্যান্ড করে একই সময়ে। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো- ঐ সময়টাতে একদম ফাঁকা ছিল। তার মানে প্রত্যেক যাত্রীকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনেক সময়ে পাবেন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস কর্মকর্তারা।

এমন ভাবতে ভাবতে মিনিটখানেকের মধ্যে আমি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সামনে। আমাকে দেখে চোখের চশমার নিচ দিয়ে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন- ‘আমেরিকায় কি কাজ?’ আমি বললাম- ‘কোন কাজ নাই। কাজ করে করে টায়ার্ড, তাই রিল্যাক্স করতে এসেছি।’

তারপর আমার পাসপোর্ট দেখলেন কয়েক সেকেন্ড। বললেন- ‘তুমি দেখি ইউরোপ ঘুরে আসছো। এখন আমেরিকায় কোথায় ঘুরবা?’ বললাম- ‘মনে হয় না বেশি কোথাও ঘুরবো। ইউরোপে ঘুরে টায়ার্ড হয়ে গেছি। ‘ আর কথা বাড়লো না। সিল মেরে পাঠিয়ে দিলেন। বিপদ এখনো কাটেনি। এরপর কাস্টমস এর মুখোমুখি হতে হবে।

ঐ ডিক্লারেশন ফরমটা হাতেই রেখেছি। ব্যাগ টেনে টেনে এগোচ্ছি। একজন ষন্ডামার্কা কর্মকর্তা সামনে পড়লেন। সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললাম- ‘হেয়ার ইজ মাই পেপার’। সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনা ঘটে গেলো। ধন্যবাদ দিয়ে আমাকে সামনে এগোতে বললো।

অথচ ফরমটা যদি সে দেখতো তাহলে ঐ একটা ফাঁকা ঘরের জন্য বহু কিছু হয়ে যেতে পারতো। কারণ, আমি বীজ বহন করছিলাম।

এত দীর্ঘক্ষণ ধরে টেনশন ধরে রাখা কঠিন কাজ। বিমানবন্দরের বাইরে এসে মনে হচ্ছিল- ‘আহ কি শান্তি!’ সেটা আমেরিকায় পা দেয়ার শান্তি নয়। বড় বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার শান্তি।

আমার ভাগ্য ভালো ছিল জন্য হয়তো আমি পার পেয়েছি। অন্যদের ক্ষেত্রে এটা নাও হতে পারে। সুতরাং আগেই জেনে নিন- কোন নির্দিষ্ট দেশে ঢোকার সময় আপনি কি সাথে নিতে পারবেন আর কি নিতে পারবেন না।

সবশেষে বলি- বীজগুলো কিন্তু আমি বাংলাদেশ পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলাম।

  • মুঞ্জুরুল করিম, সম্পাদক, প্রবাস কথা 

প্রথম পর্বের লিঙ্ক-আমার বিদেশ ভ্রমণ ও ভুল থেকে শিক্ষা; পর্ব-০১

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.