Featured রঙ্গের দুনিয়া

আমার প্রবাস জীবন (৫ম পর্ব)

শেয়ার করুন

শুরু করলাম টুরিজম জব,বেশ এনজয় করছি। সারা পৃথিবীর টুরিস্ট আসছে তাদের সাথে ডিল করতে হয়। ভালোই লাগে। এরমধ্যেই গ্রাজুয়েশন হয়ে গেলো কিন্তু মাষ্টার্স করা হলোনা নানান জটিলতা এবং ইচ্ছেশক্তির দুর্বলতার কারনে। কেন যেন মন টানছিলোনা খুব একটা। যাহোক অর্ধশিক্ষিত রয়ে গেলাম এবং লেখাপড়া ছাড়ার পর কিছুদিনের জন্য অবৈধ হয়ে গেলাম। তবুও টুরিজমে জব করছি কোনরকম অসুবিধা ছাড়াই কারন আমি সরাসরি লিগ্যাল ভিসা নিয়ে আসছি ইউরোপে যা সেইসময় বেশ রেয়ার ছিলো। আমাকে অনেকেই বলতো,মানুষ পড়তে যায় লন্ডন,আমেরিকা,কানাডা আর আপনি আসছেন ইতালি। ইতালি কি করবেন লেখাপড়া করে। অনেক বড় ভাই আমাকে মিসগাইড করার শত চেষ্টা করেছেন কিন্তু আমার চেষ্টায় অনড় ছিলাম।

যাহোক,ট্যুরিজমের উপর আবার লেখাপড়া শুরু করলাম,রাতে পড়ি। এবার ইচ্ছে গাইড হবো যে কিনা সারা পৃথিবী থেকে আসা টুরিস্টদের গাইড করবে। ধীরে ধীরে বেশ কয়েকটি ভাষাও শিখে গেলাম। উল্লেখ্য যে ট্যুরিজম জবে আপনি যতো ভাষা পারেন ততো সুবিধা আপনার জন্য। তাই আমার টার্গেট স্প্যানিশ,জার্মান,ফ্রাঞ্চিস ,ইতালিয়ান আর ইংলিশতো আছেই। কাজের জায়গায় মালিক আমার প্রতি মুগ্ধ কিন্তু নোংরা রাজনীতির শেষ নেই কারন আমাদের বাংলাদেশী লোকজন বেশী।

এখানে চলছে ইতালিয়ান ও বাংলাদেশীদের দৌরাত্ব,অন্যান্য জাতি আসে কয়েকদিন কাজ করে আবার বিদায়। আমাকেও বের করে দেয়ার নানান তালবাহানা করছেন বাংলাদেশী ভাইয়েরা কারন স্বচেষ্টায় মাথা খাটিয়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং কাউকে তোষামোদি করিনা আর তোষামোদিই বা করবো কেন? আমিতো কাজ খুঁজতে আসিনি,কাজ আমাকে খুঁজেছে সুতরাং তোষামোদি করবো কেন? আর আমি কারও কাছ থেকেও কোন সুবিধা নিচ্ছিনা। নিজের মাথা খাটিয়ে কাজ করছি বিনিময় আমি সহ মালিকও চরম লাভবান হচ্ছে। তখন বেশ ভালো বেতন পাই। সেই সময়ে ২/৩ জনের বেতন একাই পাই আর আমি যা পাই তার ৩ গুন পায় মালিক আমার দ্বারা। এটাই হচ্ছে হিংসার মুল কারন।

মালিককে অনেকবার বাঙ্গালী জাতি আমার বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু মালিক কখনো পাত্তা দেয়নি। আসলে নোংরামিকে কখনোই প্রশ্রয় দেইনি তাই নিজের মতো নিজে চলেছি এবং পারলে কারো উপকার করার চেষ্টা করেছি।

লাবন্য দেশে মেয়েটাকে নিয়ে একা কষ্ট করছে তবে ভাইবোন সবাই ওর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো বিধায় তেমন কোন কষ্ট হয়নি। দেশে যাবো ভাবছি কিন্তু ডকুমেন্টারী সমস্যা হয়ে গেলো। আমাকে নাকি অপেক্ষা করতে হবে কিছুদিন। কি আর করা,ঐ ভিডিওচ্যাট ছিলো বিধায় পেরেছিলাম লাবন্যকে ছাড়া সাড়ে ৫ বছর থাকতে। যাহোক ২০০৯ সালে আবার ডকুমেন্ট করার সুযোগ আসলো এবং আমি যথারীতি জমা দিলাম কোনরকম কষ্ট ছাড়া কিন্তু আশেপাশের অনেকেই ঝামেলায় পড়লো,যেমন আমার বন্ধু কামাল,নুরু,তারেক ভাই,দুলাল ভাই,রাশেদ ভাই আরও আরেক দুলাল ভাই। উল্লেখ্য যে সে সময় লোক না থাকলে ডকুমেন্ট বাবদ ৫/৬ হাজার ইউরো লাগে। এদের সবার অবস্থাই করুন। কি করবো,কার কাছে যাবো বুঝতে পাচ্ছিলাম না। এক প্রকার কাজ বাদ দিতেই ঘুরেছি ওদের জন্য এবং অবশেষে খুব কম খরচে ১৫০০/২০০০ইউরো করে লাইন বের করে সবারটাই জমা দিলাম তবে জমা দেয়ার সময় ৫০০ইউরো লেগেছিলো সেটা অনেকেই দিতে পারেনি যা আমার নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলাম। সকলেই তখন খুশিতে আত্নহারা কারন এমন সাহায্য কেউ কাউকে ঐ সময় করেনা।  মুলকথা,টাকা ছাড়া কেউ কাউকে দেখেইনা। অনেকে দেশ থেকে জমি লাগিয়ে বা বিক্রী করে ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে সে সময় লোকমারফত। এটা ছিলো খুব ভালো একটা ব্যবসা পুঁজি ছাড়া আর আমি নিজ থেকে খোঁজ নিতে গিয়েছি যে জমা হয়েছে কিনা যার মধ্যে স্বার্থের কোন ছোঁয়া ছিলোনা।

২০০৯ সালে আল্লাহর অসীম রহমতে নিজের ডকুমেন্ট সহ বাকী ৬/৭ জনের কাগজপত্র জমা দিলাম নি:স্বার্থে এবং কারও জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করে। ট্যুরিজমে জব করে যাচ্ছি যে কাজ আমাকে কখনোই ক্লান্ত করেনি। আমার কাছে রথ দেখা আর কলা বেঁচার মতো। পাশাপাশি স্ব-জাতি ভাইদের হিংসা দিন দিন বেড়েই চলছে আমার প্রতি কারন ইতালিয়ান বস এর কাছে খুব প্রিয় পাত্র হয়ে গেলাম খুব তাড়াতাড়ি। আমাকে মালিকের কাছ থেকে দূরে সড়ানোর অনেক চক্রান্তই করেছে কিন্তু সফল হয়নি। আমি যেটি সবসময় বিশ্বাস করতাম,”Honesty is the best policy” তাই কোন অসৎ কাজ আমার দ্বারা কেউ করাতে পারেনি। এদিকে ৫/৬ মাসের মধ্যে আমিসহ অনেকেই ডকুমেন্ট পেয়ে গেলো কিন্তু তারমধ্যে দুজন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে বরং বেইমানি করলো। একজনের কাছে ৩০০০ ইউরো পেতাম ১৫০০আগে এবং ১৫০০ইউরো খরচ করে ডকুমেন্ট করে দিলাম অথচ টাকা না দিয়ে দেশের চলে গেলো আমাকে না জানিয়ে আরেকজনের জন্যও নিজের পকেট থেকে ১৫০০ ইউরো দিয়ে ডকুমেন্ট করে দিলাম সেও একই অবস্থা তবে বাকী সবাই কোন সমস্যা করেনি বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে কারন সে সময় কেউই ৫০০০/৬০০০ ইউরোর নিচে ডকুমেন্ট করতে পারত না লোকজন ছাড়া। আমিও ডকুমেন্ট পেয়ে গেলাম এবার লাবন্যর কাছে যাবো,মায়ের কাছে যাবো,মেয়ের কাছে যাবো কিন্তু একটি ইচ্ছে ছিলো আগে থেকেই বা বলতে পারেন পাগলামী ছিলো যে,দেশে যাবার আগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে লেকের ধারে ৫ তারকা হোটেলে ২ রাত ৩ দিন কাটাবো তাই মালিক কে বললাম ছুটির জন্য এবং তৎক্ষনাত ছুটি মঞ্জুর।

এবার চলে গেলাম সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এবং লেকের ধারে ৫ তারকা গ্র্যান্ড হোটেলে একটি রুম ভাড়া করলাম যার ২ রাতের ভাড়া ছিলো ১৪৪০ ইউরো তবে রুম থেকে লেকটি স্পষ্ট দেখা যায় যেটি আমার স্বপ্ন ছিলো। দুদিন ঘুরে ঘুরে শহরটি উপভোগ করলাম যা অসম্ভব সুন্দর লাগলো।

এবার দেশে যেতে হবে এবং সবার জন্য শপিং করা চাই,না হলে অনেকের মন খারাপ হতে পারে। তাই সবার জন্য বিখ্যাত ব্র্যান্ডের সবকিছু কিনলাম যাতে আমার ৮০০০ ইউরোর মতো লেগেছিলো। কাউকেই বাদ দেইনি,ভাই ভাবী,বোন দুলাভাই,ভাতিজা ভাতিজার বউ,ভাতিজি ভাতিজির জামাই,ভাগ্নে ভাগ্নের বউ,ভাগ্নি ভাগ্নির জামাই,কাজের লোকসহ আরো অনেকেই। সব মিলে ১০৫ কেজি হলো অথচ নিতে পারবো ৫০+১০=৬০ কেজি কিন্তু আমাকে সবই নিয়ে যেতে হবে তাই অবশেষে বাংলাদেশ বিমানে ৪৫ কেজি বেশীর জন্য ১৫ কেজির চার্জ দিলাম। দেশে যাবো দীর্ঘ সাড়ে ৫ বছর পর। একবুক কষ্টের অবসান। মনে মনে সংশয়,আমার মেয়েটি আমাকে চিনবেতো,আমার কোলে আসবেতো?? যদিও প্রায় প্রতিদিনই ভিডিও চ্যাট করতাম স্কাইপে বা ইয়াহুতে তারপরেও বাস্তবতা বলে কথা। যাহোক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিট করলাম এবং লাবন্যকে বললাম মা সহ যারা আসবে তাদের নিয়ে বিমানবন্দরে আসতে কারন প্রথমবার বলে কথা। সবার আগে আমার মেয়েটাকে দেখলাম কিন্তু মেয়েটা কোলে আসলোনা লজ্জায়। শুধু বললো,জানি তুমি আমার বাবা কিন্তু এখন কোলে আসবোনা। কি আর করা তবুওতো পিচ্চি মেয়েটা চিনতে পেরেছে এবং কথা বলেছে। মাকে পায়ে ধরে সালাম করতেই মা কেঁদে দিলে তারপর বুকে জড়িয়ে ধরলেনআহ কি যে শান্তি অনুভব করলাম তখন যেন সাড়ে ৫ বছরের কষ্ট এক নিমিষে শেষ হয়ে গেলো মায়ের বুকে। লাবন্যকেও জড়িয়ে ধরলাম সবার সামনেই,এতোকিছু দেখতে পাবোনা কে কি মনে করবে,জানের জান বলে কথা। অবশেষে টাংগাইল বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।আহ! নিজের মাতৃভূমিতে আসলাম নিজের শহরে আসলাম কি যে এক শান্তি। দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর পর দেশে আসলাম সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো তারপরেও আমার জন্মভূমি সুতরাং ভালোই লাগছে। আমার লাবন্য সেই আগের মতোই আছে বিশ্বসুন্দরী। বাড়ী আসার পর মেয়েটা আমার কোলে আসলো এবং ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। আশ্চর্যের বিষয় মেয়েটার স্বভাব অনেকটাই বাবার মতোই আর শারীরিক গঠনও বাবার মতোই। এভাবে ৪ মাস কাটিয়ে চলে এলাম রোম শহরে। এসে দেখি মালিকের মনোভাব কেমন যেন এলোমেলো অথচ যাবার আগে মন ছিলো প্রফুল্ল এবং মালিক নিজেই বলেছে ৪/৫ মাস থাকার জন্য। বুঝতে বাকি রইলোনা যে কি পরিমান রাজনীতি হয়েছে অর্থাৎ আমাদের দেশী ভাইয়েরা কঠিন রাজনৈতিক চাল দিয়েছেন। যাহোক যথারীতি কাজ করে যাচ্ছি এবং হঠাৎ একদিন মালিক কল করে দেখা করতে বললো,দেখা করলে আমাকে এমন কিছু করতে বলে যা করা সম্ভব না সুতরাং অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম চাকুরিটা ছেড়ে দেবো আর তাই করলাম কারন মালিক চাচ্ছেন যে আমি কাজটা ছেড়ে দেই নিজে থেকে। তবে যাবার আগে মালিককে বললাম,আমি তোর কাছে কখনোই কাজ খুঁজতে আসিনি কিন্তু তুই কাজ করার জন্য বাধ্য করেছিলি নানান কথা বলে আর আজকে তুই অন্ধ হয়ে গেছিস না হয় চোখে বেশী দেখছিস তাই তুই হীরা ফেলে কাঁচকে তুলে নিচ্ছিস তবে যেদিন তোর হুস হবে সেদিন আমাকে খুঁজবি কিন্তু আমাকে আর পাবিনা

 বাংলাদেশী ভাইদের যারা চক্রান্ত করেছে তাদেরকে বললাম,ভাই আপনাদের জয় হয়েছে এবার চুরি ভালোভাবেই করতে পারবেন। আমি আর থাকছিনা। সবাই খুশিতো? মনে রাখবেন,এম কে রহমান লিটন আল্লাহর রহমতে না খেয়ে থাকবেনা বা দ্বারেদ্বারে চাকরি খুঁজবেনা কারন আমি নিজেকে এমনভাবেই তৈরী করেছি যে চাকরী আমাকে খুঁজবে। আপনাদের মতো চামচামী আর ক্রিমিনালীর শিক্ষা নেইনি আর কোনদিন নেবোনা, আপনার ভালো থাকুন।

এর মধ্যে যারা ভালো ছিলো তারা আমাকে বুকে জড়িয়ে কান্না করেছে এমনকি মালিকের আপন ভাই,মেয়ের জামাইও অনেক কেঁদেছিলো সেদিন। ওরা আমাকে নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিতও ছিলো যে কাজ যদি না পাই কিন্তু আমি মোটেই ভাবিনি। বাসায় এসে মাকে আর লাবন্যকে বললাম,স্বাভাবিক অবস্থায় দেশেও চিন্তায় পড়ে গেলো। যাহোক শান্তনা দিলাম তারপর হঠাৎ একটা কল আসলো,ট্রামবাস ওপেন থেকে অর্থাৎ যে কোম্পানিতে আমি কাজ করতাম সে কোম্পানীর ডিরেক্টর।

(একটু পরিস্কার করে বলছি,”Trambus open”হচ্ছে রোম শহরের সরকারী বড় এবং শক্তিশালী ট্যুরিজম কোম্পানী যেখানে হাজার হাজার মানুষ চাকরী করে। আমি যে ইতালিয়ান মালিকের কাজ করতাম,ওর সাথে কাজ করেছি কিন্তু সকল কিছু ম্যানেজ করেছি আমি নিজেই Trambus open এর সাথে যার বিনিময় আমার দ্বারা অনেক টাকা ইনকাম করেছে ঐ ইতালিয়ান মালিক। বাংলাদেশী কিছু ক্রিমিনালের কারনে লোভ বেড়ে গিয়েছিলো ইতালিয়ান মালিকের আর তাই চক্রান্ত করেছিলো আমার সাথে)।

যাহোক,ডিরেক্টর কল করে দেখা করতে বললো পরেরদিন।
অফিসে গেলাম আর ডিরেক্টর সবকিছু শুনতে চাইলো আমি সত্য ঘটনাটি খুলে বললাম,ডিরেক্টর বললো,আমি ছুটিতে ছিলাম এবং গতকাল রোমে ফিরেছি আর এসেই তোর কথা জানতে পারলাম,তুই আমাকে কল করে জানাসনি কেন? বললাম,এমনি জানাইনি আর মনটাও খারাপ ছিলো। ডিরেক্টর বললো,ওরতো তোর কাছে কৃতজ্ঞ থাকার কথা আমি তোর জন্য ওর সাথে কন্টাক্ট করেছি কিন্তু করলো তার উল্টো? আমাদের তোকে দরকার সুতরাং কবে থেকে কাজে জয়েন করবি ?

আমি অত্যন্ত খুশি হবো যদি তুই আমাদের সাথে সরাসরি কাজ করিস এবং তোর জন্য যা যা করতে হবে সব করবো। এতোবড় একটি কোম্পানীর প্রধান যখন এভাবে বললো তখনতো না করার কোন রাস্তা নেই। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। দেশে কল করে মাকে আর লাবন্যকে বললাম,সবাই খুব খুশি হলো…………………।

 

 

কোটি প্রবাসির মুখপাত্র, প্রবাস কথা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.