Featured ইউরোপ ইতালী

আমার প্রবাসী হওয়ার কারণ, পর্ব- ০২

শেয়ার করুন

নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হলো, কারন আমাদের পুরো লিগুরিয়া বিভাগে মোট পনের জন বাংলাদেশ থেকে স্পন্সরশীপ লোকের অনুমতি পাশ হয়েছে সরকার থেকে। আর সে হিসেবে সাভোনা জেলা থেকে মাত্র দুজন, যেখানে হাজার হাজার কাগজ জমা পড়েছে সেখানে নিজেদের কাগজ লাগবে কিনা আশাতীত ছিলো আপু।

উপর ওয়ালার কৃপা আর মায়ের দোয়া ছিলো আপুর সাথে, তাই কাগজ লেগেছে, সাভোনার ভাগ্যবান দুজন ছিলাম আমি আর আমার ছোট ভাই, পনের জনের মধ্যে আমার সিরিয়াল ছিলো লাকি সেভেন আর ছোট ভাই আসছিলো চৌদ্দ নাম্বারে। যে শুনে আশ্চর্য হয়, আপুকে এসে অনেকেই ধরলো, স্পন্সরশীপ বিক্রি করার জন্য।

আমাদের না এনে যেনো স্পন্সারটা বিক্রি করে দেয়, কেউ তেরো লাখ টাকা নিয়ে রেডি, কেউ পনেরো লাখ টাকা নিয়ে রেডি, কিন্তু আপুর একটাই কথা, সব কিছুর আগে আমার পরিবার, আর আমি এখানে ব্যবসা করতে আসিনি। আপুর এমন কথায় অনেকেই অসন্তুষ্ট হল। মা খবরটা শুনে খুব খুশি হলো, আবার মন খারাপও হয়ে গেলো কিছুটা।

ভিসা পাওয়ার পরে শুরু হলো আরেক যুদ্ধ, ম্যানপাওয়ার অফিসে যায় সেখানেও ঝামেলা। টাকা খাওয়ার ফন্দি, যেই অফিসে যাই সেখানেই হয়রানি। এদিকে ছোট ভাইয়েটা হয়ে গেলো খুব সহজেই। যত্তো ঝামেলা আমার বেলায়! না আমার ইতালির কাগজে কোন ঘাবলা বা ঝামেলা ছিলো না।

এদিকে ডকুমেন্টেরও সময় শেষ হয়ে আসছে.০ কি যে এক পরিস্থিতি মাঝে সময় অতিবাহিত হচ্ছে কেবল আল্লাহই জানে। তারপর একসময় সমস্যা শেষ করে যখন মিনিস্ট্রি অফিসে এসে কাগজ জমা হলো, ভাবলাম যাক এখান থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসতে পারবো। কিন্তু বিধিবাম এখানেও আটকে দিলো আমাকে।

অনেক টাকা খেলো এখানেও, কিছু সৎ লোক আছে টাকা খেলেও অনেক দায়িত্ব পালন করে, আমি তেমনিই একজনের কাছে পড়লাম। আমাকে ডাকা হলো মিনিস্ট্রি অফিসে, অনেক নার্ভাস ফিল করছিলাম, যখন মিনিস্টারের সামনে গেলাম আমাকে অনেক প্রশ্ন করা হলো, কোথায় যাবো, কেনো যাবো, থাকবো কোথায়, কার সাথে থাকবো, আরো অনেক প্রশ্ন করতে করতে আমাকে ক্লান্ত বানিয়ে ফেলেছে।

প্রায় এক ঘন্টার বেশি আমাকে শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অবশেষে আপুর সাথে ফোনে সরাসরি কথা বলে পুরোপুরি শিউর হয়ে ফাইল সাইন করেছে। আর এতো ঝামেলা করার একটাই কারণ, আমার বয়স কম ছিলো এবং অবিবাহিতা মেয়ে মানুষ এটাই দোষ। অবশ্য তাদেরও দোষ নেই, তখন কয়েকটা ঘটনাও ঘটেছিলো মেয়েদের বিদেশ পাচার নিয়ে, তাই পরিস্থিতি গরম ছিলো।

অবশেষে মোটামুটি প্রায় সব অফিসের কাজ শেষ, প্লেনের টিকিট ও বুকিং দিয়ে গেছে আপু, আর হ্যা, এর মাঝে আপুরা ও ভাইয়া সবাই আসছিলো  দেশে।

বড় আপুরও হুট করেই বিয়ে হয়ে গেলো, অন্তত মা তার একটা মেয়ের বিয়ে দেখে যাওয়ার ভাগ্য হলো, ছোট ভাইয়ের সব কিছুই প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলো তাই মেঝো আপুর সাথে চলে গেলো।

বিদেশে আসার আগেই এক প্রকার সব আত্নীয়, স্বজন হারিয়ে ফেললাম, বাবার বাড়ীর দিক থেকেও , আর মায়ের বাড়ীর দিক থেকে তো কথাই নেই। সবার একটা আক্ষেপ তাদেরকে বিদেশ নিয়ে যায় না কেনো, সবাই প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে মরছে।

কেউ আমাদের পরিস্থিতি দেখছে না, আমরা যে কতটা অসহায়, আমার মা যে অসুস্থ তাতে কারো কিছু আসে যায় না কেউ মাকে একটু শান্তনা দিবে কি, সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত? আমাদের জন্য কারো মুখ থেকে আশার আলোর বানী বের হলো না। কেউ একবারের জন্য বলার নেই, তোর মার জন্য চিন্তা করিস না, আমরা আছি, আমরাই দেখবো, মায়ের আপন বোনও না।

আমরা ভালো থাকি এটা কারো সহ্য হচ্ছে না। অবশ্য তাদের অবস্থা সব সময় ভালোই ছিলো এবং আছে, কিন্তু আমরা যে এতিম ছিলাম, আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছে, কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায়নি কিন্তু আমার মায়ের কখনো অন্যের কোনকিছুর প্রতি লোভ ছিলো না। না খেয়ে থাকলেও মা কারো কাছে হাত পাততো না।

আমাদেরও ঠিক সেই শিক্ষা দিয়েছে মার যা ছিলো তাই নিয়ে সন্তুষ্টি থাকতে পছন্দ করতো। বিদেশের জন্য আমরা আজ সকল আত্নীয় স্বজন হারিয়েছি, আমার মা একটা কথাই বলতো যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছে, সৎ পথে থাকলে আল্লাহ ঠিকই তার বান্দাকে সাহায্য করবে। ইনশাল্লাহ ঠিক আমরা সকল বাধাবিপত্তি থেকে মুক্তি পেয়েছি।

ছোট ভাইটা যাওয়ার পরে মা আরো অসুস্থ হয়ে যায় আরো ভেঙ্গে পড়ে মনের দিক থেকে। ওর যাওয়ার প্রায় দুই সাপ্তাহ পরে আমার যাওয়ার ঠিক হলো।

  • শাহানা আক্তার, সাভোনা, ইতালি

আরও পড়ুন- আমার প্রবাসী হওয়ার কারণ, পর্ব- ০১

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.