Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া

অস্ট্রেলিয়ার দাবানল; কিসের বার্তা দিচ্ছে এই বিপর্যয়?

শেয়ার করুন

দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে বনের পর বন। আশেপাশে থাকা বসতি পুড়ে ছাই তো হয়েছেই, বেঁচে নেই বিপন্ন প্রাণীদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রাণী। কিন্তু কেন ঘটেছে এই অগ্ন্যুৎপাত?

এই দাবানলের সূত্রপাত কোথায়?

দাবানলের সূত্রপাত নিশ্চিতভাবে বলা অনেকটা অসম্ভবই বটে। তবে যেহেতু অস্ট্রেলিয়ার এই দাবানলের পেছনে প্রত্যক্ষভাবে প্রকৃতি ও পরোক্ষভাবে মানবসমাজকেই দায়ী করা হচ্ছে তাই এর সূত্রপাত সম্পর্কে অল্পবিস্তর হলেও জানা গেছে।

গত ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়। এই আগুন পরবর্তীতে ১৫ হাজার হেক্টর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে একটি বাড়ি ধ্বংস হয়। এই আগুনের ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে পুলিশ।

আহত কোয়ালা

তবে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ দাবানলের আঘাতে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। এর পেছনে দায়ী মূলত ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। তবে ডিসেম্বর নয়, জানা গেছে গত ১২ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার ‘সাউথ ওয়েলস’ এ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই আগুন নিয়ন্ত্রণে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর ১০০ জনকে পাঠানো হলেও তারা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।

সাউথ ওয়েলসের এই আগুন নিয়ন্ত্রণ করার সময় দুজন স্বেচ্ছাসেবক মারা গেলে এই আগুনের খবর সামনে আসে। ১ হাজার ২৯৮ টি বসতবাড়ি, ৪৮ টি দোকান, ২ হাজার খামার শুধুমাত্র সাউথ ওয়েলসের আগুনেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে তখনো অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী আগুনের বিষয়টিকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করেননি।

দাবানলের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত?

দাবানলে অস্ট্রেলিয়ার ‘নিউ সাউথ ওয়েলস’, ‘ভিক্টোরিয়া’ এবং দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াই বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আজ ৮ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে ১০ কোটি ৭০ লক্ষ হেক্টর অঞ্চল আগুনে পড়েছে। অর্থাৎ ১ লক্ষ ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে যার মধ্যে ৫ হাজার ৯০০ টি বিল্ডিংও আছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কাগজে কলমে হিসাব করলে দাঁড়ায়, এই দাবানলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার ১১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থমূল্যের ক্ষতি হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ক্যাঙ্গারু দ্বীপ
(পূর্বের অবস্থা ও বর্তমান অবস্থা)

মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা কি জানা গেছে?

‘না’, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা জানা যায়নি। তবে দাবানলের আঘাতে ২৮ জন মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। তবে শুধু মানুষের মৃত্যুতেই শোকাহত নয় বিশ্ব। বরং প্রাণীদের অভয়ারণ্য বলে খ্যাত এই অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চলের আগুনে প্রাণীদের মৃত্যুতেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো বিশ্বে।

‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার’ এর মাধ্যমে জানা গেছে,  ১ হাজার ২৫০ কোটি বা ১.২৫ বিলিয়ন প্রাণী এবং পাখির মৃত্যু ঘটেছে এই আগুনের ভয়াল থাবায়। এদের মধ্যে আছে- কোয়ালা, ক্যাঙ্গারু, গ্লাইডার, পোটোরুস, ককাটুস এবং হানি-ইটারসসহ বিপন্ন আরও কয়েক সহস্রাধিক প্রাণী ও পাখি।

কে দায়ী এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে?

প্রকৃতির সৃষ্ট দাবানলের ফলে এই ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত হলেও মানুষের দায়ভার এখানেও কম নয়।

‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার’ এর সিইও ডারমট ও’গোর্মা বলেন,

“অস্ট্রেলিয়া দাবানলের স্থান, তবে এবারের দাবানলের ভয়াবহতা একেবারেই স্বাভাবিক নয়। জলবায়ু পরিবর্তন দাবানল সৃষ্টি না করলেও এটি দাবানলকে আরও ভয়ংকর করে তুলতে সক্ষম।”

প্রায় ৮ হাজার কোয়ালা মারা গেছে এই আগুনে যা অস্ট্রেলিয়ার মোট কোয়ালার এক তৃতীয়াংশ। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের মোট প্রাণীর ৩০ শতাংশ এই আগুনে পুড়ে অথবা পানি ও খাবারের অভাবে মারা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন সরাসরি দাবানল সৃষ্টিতে মানুষের ভূমিকা না থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রা অধিক হারে বেড়ে যায় বলেই দাবানল সৃষ্টি হতে পারে যেকোনো বনভূমিতেই। এরই শিকার এই অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চল।

আগুনে পুড়ছে জনবসতি

সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে দাবানলে পুড়ে যাওয়া এলাকাগুলোতে সাহায্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসান। তবে দাবানল সংকট মোকাবেলা দক্ষতার পরিচয় না দিতে পারায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে গত ২ দিন যাবত অল্প বিস্তর বৃষ্টিপাত হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায়। ধীরে ধীরে দাবানলের প্রকোপ কমতে শুরু করলেও এই বৃষ্টি আগুনকে উস্কে দিতে পারে এমন আশংকাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না দমকলবাহিনী। তবে ক্ষতির পরিমান যেন আর বৃদ্ধির দিকে না যায় সেদিকেই নজর তাদের।

  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.