Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া ভ্রমণ

অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া ডায়েরি; পর্ব- ০২

গতরাতের ঘুম মারাত্মক একটা ক্ষতি করেছে, প্রায় দুপুর বেলা ঘুম ভাঙ্গলো। এলার্ম দিয়ে ঘুমাইনি তাই নিজের উপর বিরক্ত হলাম খুব, ঘুরতে এসে পড়ে পড়ে ঘুমানোর কোন মানে নেই, তার উপর মাত্র ১০ ঘণ্টার মত দিনের আলো পাওয়া যায় এখানে। ঘুমের মধ্যে দেখছিলাম আসলে আমি পাহাড় পর্বত নদী সমুদ্র সব চষে ফেলছি পরে জেগে দেখি সকাল ১১ টা বাজে।

ঝটপট নাশতা করে বেরিয়ে পড়লাম। আগেরদিন যেখানে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম, এখন রওয়ানা দিলে সেখানে গিয়ে লাভ হবে না, তাই চলে গেলাম সিটির ইনফরমেশন সেন্টারে, উদ্দেশ্য আজকের দিনের মধ্যে কোথয় কি করা যায় এবং বাকি সবদিন কোথায় কোথায় যাওয়া যায় তার একটা পরিপূর্ণ প্ল্যান তৈরি করা।

প্রায় সব জায়গা নির্দিষ্ট সময় বন্ধ হয়ে যায়, তাই সেগুলোও ভালো করে জেনে নিতে হবে। এইসব সেন্টারে সকল প্রকার লোকাল বিজনেস সম্পর্কে বিস্তারিত সকল তথ্য, যোগাযোগ এমনকি সময়, আগ্রহ, আবহাওয়া, খরচ এসব মাথায় নিয়ে আন্তরিক ভ্রমণ প্ল্যান সম্পূর্ন বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

ইনফরমেশন সেন্টারে যে ভদ্রমহিলাকে পেলাম সে অতিরিক্ত ভালো, যাই জিজ্ঞাসা করি তার বিস্তারিত তথ্য দিল, বারবার ম্যাপ এঁকে, টার্ন বাই টার্ন প্রিন্ট করে দিচ্ছে। একটু পর পর তাকে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছিল, যে আমাদের কাছে জিপিএস নামক বস্তুটা আছে এবং আমাদের সাথে গাড়ি আছে। অনেকগুলো জায়গা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, ভদ্রমহিলা বলেই যাচ্ছে।

একটু পর পর ঘড়ি দেখছি, অনেকবার কথা বার্তা ঘুরিয়ে নিয়েছি কিন্তু উনি বিস্তারিত বলবেনই। আমার বেশ কিছু গুরুতপূর্ণ জিজ্ঞাসা ছিল তাই চলে যেতেও পারছিলাম না। তাসমানিয়ান ডেভিল দেখবো বলে ঠিক করেছিলাম। দুটো অপশন ছিল একটা শহরের কাছে, প্রায় ৩০ মিনিট ড্রাইভ আরেকটা দেড় ঘণ্টার উপর ড্রাইভ, সেটা পোর্ট আর্থারে। পোর্ট আর্থার যাবার প্ল্যান আগে থেকেই ছিল কিন্তু সেটা পুরো দিনের জন্য। পরের কয়দিনের সম্ভাব্য প্ল্যান করে সবকিছু চিন্তা করে আজকেই পোর্ট আর্থার দেখে আসবো বলে সিদ্ধান্ত নেই।

যাই হোক, এই অতি ভদ্রমহিলার কাছ থেকে যখন ছাড়া পেলাম তখন প্রায় একটা বাজে। গাড়িতে উঠে খেয়াল হল যে ক্যামেরা হোটেলে রেখে এসেছি। তাড়াহুড়োয় ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে দৌড় দিয়েছি, ভেতরে যে শুধু লেন্সগুলো আছে কিন্তু ক্যামেরা নাই সে খেয়াল করিনি। ক্যামেরা উদ্ধার পর্ব শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম। প্রাথমিক গন্তব্য তাসমানিয়ান ডেভিলের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎ, পোর্ট আর্থারের কিছুটা আগে জায়গাটা একটা ‘না চিড়িয়াখানা’।

আসলে চিড়িয়াখানার মত না করে অনেকটা সাফারি পার্কের মত জন্তু জানোয়ার ছেড়ে দেয়া থাকে তাই নাম দিয়েছে (UnZoo)। পথ চলা শুরু হল, তাসমান ব্রিজ এবং এয়ারপোর্ট পেরিয়ে উল্টোদিকে যেতে হয়। রাস্তাটা অতিরিক্ত সুন্দর, পথের দু’পাশে দিগন্ত বিস্তৃত খামার, পাহাড়ের ঢালে শত শত ভেড়ার পাল তার পেছনে বিশাল নীল জলরাশি। এ যেন এক টুকরো স্বর্গ। আর এই স্বর্গীয় পরিবেশটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে ফেললো। রাস্তায় কতটুকু যেতেই মনে হয় এত সুন্দর তো আগে দেখিনি, যথারীতি গাড়ি থামিয়ে নেমে সেটা উপভোগ করা, কিছু ছবি তোলা। এভাবে দিনের যেটুকু সময় ছিল তাও প্রায় চলে গেল।

পোর্ট আর্থার যেতে চোখে পড়বে এমন মনোরম দৃশ্য

এবার সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে আর কোথাও থামা হবে না, একবারে (UnZoo) তে গিয়ে থামবো। কিন্তু বিধিবাম। রাস্তায় হঠাৎ দেখলাম পরের এক্সিটে ব্লো-হোল দেখাচ্ছে। সিডনির কাছের কিয়ামার ব্লো-হোল তো দেখেছি, জোয়ারের একটা বিশেষ সময়ে সমুদ্র পাড়ের একটু ভেতরে পাথরের খাঁজ থেকে বিশাল ফোয়ারার মত ছিটকে পানি বেরিয়ে আসে। পাথরের নিচ দিয়ে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ যার আসল কারণ। সেটা অনেক প্রিয় একটা যায়গা আর এটা না দেখে যাবো? এক্সিট নেয়া হল, রাস্তা বদলে গেলাম ব্লো-হোলের কাছে। ১০ মিনিট সময় বেঁধে দিলাম এটা দেখার জন্য।

দুর্ভাগ্যবশত জোয়ার-ভাটার ভুল সময়ের জন্য ব্লো দেখা হলনা। কিন্তু জায়গাটা দেখে মুগ্ধ হলাম, সামনের একটা জায়গা ছিল ফসিল বে, নামটার মতই সুন্দর। আরো ছিল ডেভিল’স কিচেন এবং তাসমান আর্চ, দুপাশে বিশাল পাথরের পাঁচিল মাঝখানে পানি, তার উপর দিয়ে পাথরের প্রাকৃতিক সেতু, অনেকটা আর্চের মত। তাসমান পেনিনসুলার অনন্য জিওলজিকাল ফর্মেশন দেখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এলাকা এটা।

ব্লো-হোলের সাথেই তিনপাশে পাহাড় ঘেরা একটা জায়গা, সুন্দর একটা লম্বা জেটি, ছোট ছোট বোট একানে সেখানে শান্ত পানিতে বিশাল রাজহাঁসের মত ভেসে আছে। জনমানুষের চিহ্ন নেই কোথাও, পানির খোলা অংশে সূর্যটা বোটগুলোর পেছনে অসাধারণ একটা পরিবেশ তৈরি করেছিল, মনে হচ্ছিল যেন অন্য কোন জগতে আছি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধ্যান ভাঙ্গলো, মনে বিশাল একটা আফসোস নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ইশ, এখানে যদি পুরো একটা দিন কাটানো যেত।

মূল হাইওয়েতে ফেরার পথে রাস্তা গুলিয়ে অন্যদিকে চলে গেলাম, কিন্তু তাতে একটুও দুঃখ পাইনি। একটু পর পর থেমেছি, নামবো না বলে শপথ নিয়েছিলাম তাই আর নামিনি, শুধু চেয়ে দেখেছি। রাস্তার একপাশে পাহাড়ি ঢালে রং বেরঙের ছোট বড় বাড়ি প্রায় ঝুলে আছে, অন্যপাশে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ঘেসোজমি এবং বরাবরের মত অগণিত পশু চরে বেড়াচ্ছে।

পোর্ট আর্থার জেটি

পাহাড়ের পাশে হেলে যাওয়া সূর্যের আলোটা এমনভাবে পড়ছে যেন মনে হচ্ছে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে সব। হঠাৎ বিশাল এক ঘোড়ার দল দেখে বিড়বিড় করে কখন যেন অজান্তেই বলে ফেলি প্রিয় কবির ততোধিক প্রিয় সে কবিতা ‘মহিনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে”।

অল্পক্ষণের ভেতর (UnZoo) তে চলে এলাম। তিনটা বাজে তখন, পোর্ট আর্থার বন্ধ হয় পাঁচটায় আর এটা চারটায়। ইনফো সেন্টার থেকে বলল যে প্রায় এক ঘণ্টা লাগবে পুরোটা ঘুরে দেখতে। অনেক ভেবে দেখলাম যে কোন একটা ভালো করে দেখা যাবে। তাই মন খারাপ করে তাসমানিয়ান ডেভিলের সাথে পরিচয় পর্ব আপাতত মুলতবি রেখে চললাম পোর্ট আর্থারে কনভিক্ট ট্রেইল খুঁজতে। গন্তব্য এখনো ৩০ মিনিট দূরে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধল অন্য জায়গায়। গুগল ম্যাপে পোর্ট আর্থার দিয়ে নিশ্চিন্তে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি সামনে রাস্তা শেষ।

শুধু একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে। সন্দেহ হল, আবার ম্যাপ দেখলাম, রাস্তায় কোন মানুষ পাইনি যে জিজ্ঞাসা করে নেব। কি আর করা, সামনে চললাম। কিছুক্ষণ পর দেখি বিশাল এক গেইট দিয়ে সে রাস্তাও বন্ধ করা, বড় বড় করে লেখা প্রাইভেইট প্রোপার্টি। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? এখনো পোর্ট আর্থার ৭ মিনিট দেখাচ্ছে। গুগলের স্যাটেলাইট ভিউতে গিয়ে দেখি পাহাড় এবং জঙ্গলের মাঝে ছোট একটা ভাঙ্গা দালান দেখাচ্ছে। এটা তো হবার কথা নয়। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।

আবার সার্চ দিয়ে দেখি ফেলে আসা রাস্তায় আরো প্রায় ২০ মিনিট দূরে ‘পোর্ট আর্থার হিস্টরিকাল সাইট’ নামে একটা যায়গা আছে। বুঝতে পারলাম আজ আর কিছুই কপালে নাই তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে সে জায়গাটা দেখে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। এমন সময় ঝুপ করে বৃষ্টি নামলো অথচ আকাশ প্রায় পরিষ্কার, এখনো রোদ আছে। যেন ‘রোদ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে, খেকশেয়ালের বিয়ে হচ্ছে’।

পোর্ট আর্থারের পথে দেখা মিলতে পারে রোদ-বৃষ্টির ঝিলিক

রোদের ভেতর বৃষ্টি অনেক দেখেছি কিন্তু এরকম পরিষ্কার আকাশে রোদের ভেতর এরকম ঝুম বৃষ্টি কখনো দেখা হয়নি। বৃষ্টির ফোটাগুলোতে প্রায় অস্তে যাওয়া সূর্যের বাঁকা আলো পড়ে অপার্থিব সুন্দর করে ফেলেছে। তার মাঝেই আবার রংধনু। এতো সুন্দর বৃষ্টি আমি আর কখনোই দেখিনি, সবকিছু ভুলে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে বৃষ্টি দেখতে বসলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই হুট করে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল, রেখে গেল বিশাল এক ঝকঝকে রংধনু।

আবার পথ চলা শুরু। এবার আসল পোর্ট আর্থার খুঁজে পেলাম। সাড়ে চারটা বাজে, গুগল ম্যাপের চৌদ্দ পুরুষকে মিষ্টি কথা শুনিয়ে তাড়াহুড়ো করে নামলাম। এবার বুঝতে পারলাম মমতাময়ী সে ভদ্রমহিলা কেন বারবার ম্যাপ এঁকে দেখাচ্ছিল। আপনারা যারা ভবিষ্যতে এখানে আসার প্ল্যান করছেন ম্যাপে ‘পোর্ট আর্থার হিস্টরিকাল সাইট’ দিয়ে আসবেন। কাউন্টারে গেলে জানালো যে ট্যুরিস্ট এরিয়া ২০ মিনিটের মধ্যে বন্ধ করে দেবে এবং ঢুকতে গেলে জনপ্রতি ২৫ ডলার টিকেট।

পাহাড় থেকে নেমে আসা কনভিক্টদের বানানো পাথরের জলাধার

তবে সাড়ে পাঁচটার দিকে ঘোস্ট ট্যুর আছে, সেখানে আবার দেড়ঘণ্টা প্রায় পুরোটা ঘুরিয়ে দেখাবে যদিও অন্ধকারে। সেটা নিলে সব মিলিয়ে লাগবে ২৭ ডলার। যেখানেই গিয়েছি ঘোস্ট ট্যুর ব্যাপারটা সবচেয়ে অপছন্দ করেছি, পারতপক্ষে এড়িয়ে চলেছি কিন্তু আর কোন উপায় না দেখে তাই নিলাম। তারপর প্রায় ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়লাম ইতিহাসের ভেতর, যেন ২০ মিনিটের ভেতরেই পুরো পৃথিবী দেখে নিতে হবে।

পোর্ট আর্থারঃ
তাসমানিয়ার রাজধানী হোবার্ট থেকে ৯৭ কিলোমিটার দূরে পোর্ট আর্থার ছোট একটা কনভিক্ট গ্রাম, বাড়িয়ে বললে শহর বলা যায়। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক স্থাপনা এখন একটা ওপেন এয়ার মিউজিয়ামের মত। মূল দালানগুলোর কাঠামো অক্ষুণ্ণ প্রায় রেখে ছাদ খুলে ফেলা হয়েছে (আগুনে পুড়ে গেছে আসলে)। পোর্ট আর্থার অস্ট্রেলিয়ার কনভিক্ট সাইটগুলোর মধ্যে প্রায় সবচেয়ে বিখ্যাত।

এটা ১৮ এবং ১৯ শতকে অস্ট্রেলিয়ান উর্বর উপকূল জুড়ে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের বানানো বিখ্যাত ১১টি পেনাল সাইটের একটি, যা এখন ওয়ার্ল্ড হেরিটেইজ প্রোপার্টির অন্তর্ভুক্ত। ১৮৩০ সালে তৈরি হবার পর থেকে এই কনভিক্ট পেনাল সাইট অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস এবং উন্নতিতে এক অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছে। প্রায় ৬০ টির মত ছোট বড় যে স্থাপনা তাও দ্বীপান্তরিত কনভিক্টদের দিয়েই তৈরি করা। তাদের দিয়েই খনির কাজ, খামার, রাস্তা, শহর, জলাধার বানানো হয়েছিল।

মূল ভবন/ কয়েদখানা

ধ্বংসপ্রায় এই স্থাপনাগুলো বিশাল স্কেলে কনভিক্ট স্থানাতর, কনভিক্টদের জীবন এবং শ্রমের মাধ্যমে ইউরোপীয় মহাশক্তির কলোলিয়াল প্রসারণের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার প্রাথমিক গোড়াপত্তন এবং তখনকার রাস্তা, রেললাইন, কৃষি প্রায় সবকিছুই ব্রিটিশ সম্রাজ্যের এই নির্বাসিত কনভিক্টদের অবদান।

পোর্ট আর্থার মূলত এই দেশের সবচেয়ে কুখ্যাত পেনাল সাইটগুলোর একটি যার বিচ্ছিন্ন এবং দুরহ ভোগৌলিক অবস্থান, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং পাহাড় ও সুমদ্রঘেরা প্রাকৃতিক দেয়াল তাকে সবচেয়ে ভয়ংকর কনভিক্ট কলোনি হিসেবে প্রতিষ্টিত করেছিল।

এর ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে কনভিক্টদের উপর অমানুষিক অত্যাচারের গল্প, তাদের আর্তনাদ, রক্ত, ঘাম এবং মৃত্যু। অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতির মাঝে ছাদহীন খোলা জেলখানার মত স্থাপনাগুলোর মাঝে দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশ থেকে কেমন যেন মৃত্যু আর বিভীষিকার গন্ধ ভেসে আসে।

অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রকম জেলখানা বা থাকার জায়গা ছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের রাখা হত শব্দহীন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যেখানে তাদের কথা বলা বা কোন প্রকার শব্দ করারও অনুমতি থাকতো না। সাধারণ কয়েদিদের থাকার জায়গাগুলো লম্বায় প্রায় ৬ ফুট এবং পাশে ৪-৫ ফুট কফিনের মত। তাদের বানানো পাহাড় থেকে নেমে আসা সুপেয় পানির খাল, জলাধার এবং ওয়াটার হুইল দেখতে পাওয়া যাবে এখনো।

পোর্ট আর্থার

মূল বিল্ডিয়ের সর্বোচ্চ তলাটি ভালো ব্যবহার এবং কাজের জন্য পুরস্কৃত কয়েদিদের জন্য ডরমেটরি হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখনো প্রায় অক্ষত বাড়িগুলোর মাঝে কমান্ড্যান্টের বাংলো, অফিসার্স কোয়ার্টার, গার্ড টাওয়ার এবং অফিস বিল্ডিঙগুলো দেখতে পাওয়া যায়। যদি ইতিহাস ভুলে থাকা যায় তবে পুরো এলাকাটা বাইরে থেকে এখনো দেখলে মনে হবে মানুষের গড়া স্বর্গীয় এক উদ্যান অথবা মনমুগ্ধকর কোন থিম পার্ক।

মূল বিল্ডিং প্রাথমিকভাবে ময়দার কল হিসেবে তৈরি হয়েছিল, পরে ১৯৮৭ সালে সেটা কয়েদিদের থাকার জায়গায় পরিণত হয়। ইউরোপ থেকে কনভিক্ট পাঠানো বন্ধ হবার পর পুরনো কনভিক্ট এবং নতুন ভয়ংকর সব স্থানীয় অপরাধীদের রাখা হত। সময়ের বিবর্তনে নানা ধাপে স্থাপনার উন্নতি এবং বুশফায়ার, ভূমিধ্বস, ভূপকৃতির পরিবর্তন, পুরনো স্থাপনা ভেঙ্গে নতুন করে তৈরির মাধ্যমে অসংখ্যবার পরিবর্তিত হয়ে আজকের চেহারা পেয়েছে। এই পুরনো প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থাপনা আজ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র যা প্রতিমূহুর্তে কলোনিয়াল কনভিক্ট সময়ের কথা মনে করিয়ে দেবে।

পোর্ট আর্থার থেকে বের হবার একমাত্র মাধ্যম ছিল মৃত্যু এবং প্রচন্ড পরিশ্রম এবং অমানবিক জীবন যাপনের জন্য কয়েদিদের মৃত্যুর হারও ছিল অত্যন্ত বেশি তাই মৃত কয়েদিদের কবর দেয়ার জন্য মূল সাইটের সামনেই ছোট একটি দ্বীপ বেছে নেয় কালেক্রমে যা ‘আইল অভ ডেড’ বা মৃতদের দ্বীপ হিসেবে বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়। সময়ের অভাবে দ্বীপটা ঘুরে দেখা হয়নি।

পোর্ট আর্থার ট্যুরিস্ট স্পটের সামনের দৃশ্য

এককালের শত শত অত্যাচার, রক্ত, খুন, ধর্ষন, হাহাকার পোর্ট আর্থারের অভিশাপ মুছে দিতে পারেনি। কলোনিয়াল যুগের শেষে আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে মড় ম্যাসাকারের সাক্ষীও এই অভিশপ্ত দুর্গ। ১৯৯৬ সালে সংগঠিত এই ভয়ানক হত্যাযজ্ঞে ৩৫ জন নিহত ২৩ জন গুরুতর আহত হয়। মাত্র একজন বন্দুকধারী পোর্ট আর্থারে আগত ট্যুরিস্টদের উপর আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে হামলা চালিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটায়, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল সমগ্র দেশকে।

সে বছরই অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট সে সময়ের সবচেয়ে সাহসী এবং যুগান্তকারী আইন পাশ করে যাতে ব্যক্তিগত স্বয়ংক্রিয় এবং আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়ে দশ লক্ষাধিক ব্যক্তিগত অস্ত্র সংগ্রহ করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় সেসময়। নৃশংস এবং লজ্জাজনক কলোনিয়াল ইতিহাসের কালিমা মুছে ফেলে আজকের সুশৃংখল সভ্য অস্ট্রেলিয়ার উত্তরণে এ যেন ছিল এক মহীসোপান।

মাঝে একবার ২০১৮ সালে সাউথওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম গ্রামে এক পরিবারের সাতজনের মৃত্যু ছাড়া আজ পর্যন্ত বড় কোন গান ভায়োলেন্স এই দেশে আর ঘটেনি। আজও বেশিরভাগ বৃহৎ পশ্চিমা দেশগুলো এরকম একটি আইন বানানোর সাহস দেখাতে পারেনি।

পাঁচটায় এক এক করে সব গেইট বন্ধ করে দেয়ার পরেও আমি আরো প্রায় ২০ মিনিট ঘুরে ঘুরে দেখেছি, ছবি তুলেছি। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রহরী একবার এসেছিল তাড়িয়ে নিয়ে যেতে, তার দিকে তাকিয়ে একটা বিব্রত অপ্রস্তুত হাসি দিয়েছিলাম। ব্যাটার মনে কি এসেছিল কে জানে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হালকা হেসে চলে গেছে। শুধু বলে গেছে ‘বেশি দেরি করোনা নয়তো হারিয়ে যাবে’।

কমান্ড্যান্টের বাংলো

হয়তো আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারতাম কিন্তু সারাদিন পেটে প্রায় কিছুই পড়েনি তাই ঘোস্ট ট্যুরের আগে তড়িঘড়ি কিছু খেয়ে নিলাম। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই দেশের ট্যুরিস্ট সাইটগুলোর ক্যান্টিনের খাবার খুব জঘন্য হয় কিন্তু এটা ব্যতিক্রম ছিল।

ঘোস্ট ট্যুরঃ
মহা আয়োজন করে দেড় ঘণ্টার ভূত অভিযান শুরু হল। অন্ধকার নেমে এসেছে, তার উপর সব আলো নিভিয়ে লুকানো মৃয়মান কিছু লাল আলো জ্বালিয়ে পুরো এলাকার পরিবেশ ভুতুড়ে করে ফেলা হয়েছিল। প্রায় ৪০ জনের দলটার হাতে আলো হিসেবে ধরিয়ে দেয়া হল মাত্র তিনটা পুরনো হারিক্যান। প্রথমে যাত্রা শুরু হল ক্যাথলিক চ্যাপেল থেকে। ট্যুর গাইড মহিলা একটু আধটু ইতিহাসের সাথে ভৌতিক স্বরে এখানে ঘটে যাওয়া ভয়ানক সব অপমৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে গেল।

কিভাবে অভিশপ্ত আত্মারা বারবার ফিরে ফিরে এসে হাহাকার করে যায় তা শুনতে শুনতে দেখলাম এক একজনের চেহারা ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। তারপর গেলাম ক্যাথলিক যাজকের বাংলোয়। জানলাম দয়ালু এই যাজকের জীবন এবং তার অপমৃত্যুর পর কিভাবে তার কফিন উপরতলা থেকে জানালা ভেঙ্গে নিচে পড়ে গিয়েছিল তার গল্প।

বুড়ো যাজকের অতৃপ্ত আত্মা এখনো কিভাবে ফিরে ফিরে আসে এবং তার প্রিয় পিয়ানোতে সুর তুলে সবাইকে বিরক্ত না করতে সাবধান করে দেয়, ভৌতিক অন্ধকারে একে একে সে গল্প শোনালো মহিলা। যদি অন্য কেউ সে পিয়ানো বাঁজাতে যায় তাহলে নেমে আসে ক্ষুব্ধ যাজকের অভিশাপ। ছোটবেলায় শোনা প্রিয় অঞ্জনের ‘জেরমির বেহালা’ গানটা মনে পড়ে কেমন যেন একটা দীর্ঘশ্বাস চলে এল।

যাজকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম অমানসিক এক পাগলা ডাক্তারের লুকানো গবেষণাগার দেখতে। অনেকটুকু পথ হেঁটে যেতে হয়। খোয়া বিছানো পায়েহাঁটা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম তারার গম্বুজ। শহর থেকে এত দূরে, মেরুর কাছাকাছি চারপাশে আলোহীন মেঘমুক্ত আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল তারাগুলো যেন ফুলে ফেঁপে বিশাল আকার হয়ে গেছে, আকাশে একতিলও ফাঁকা নেই। এত নিচুতে যেন লাফিয়ে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।

গাইড মহিলা পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল একটা বিল্ডিং এর নিচের পাতালঘরে। পাগলাটে সেই ডাক্তার নাকি এখানে অসুস্থ, আহত এবং মারাত্মক অপরাধীদের উপর ভয়ানক সব গোপন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাত। ডোম ঘরের মত একটা ঘরে বিশাল এক পাথরের টেবিল, সেখানে কয়েদিদের কাটাছেড়া করতো সে। ভালো করে খেয়াল করলে এখনো রক্তের শুকানো দাগ দেখতে পাওয়া যাবে।

মাটির নিচের ঘরটি এমনিতেই হিমাংকের নিচে ভীষণ ঠাণ্ডা তার উপর মৃদু হারিক্যানের আলোতে অশরীরী প্রেতাত্মাদের গল্প শুনতে শুনতে লোকজনের শিওরে ওঠা টের পাচ্ছিলাম। ইতিহাস বলা শেষ হতে আরেকটু ভয় লাগাতে ভদ্রমহিলা কণ্ঠ এবং আলো দিয়ে নানা কায়দা কসরত শুরু করে। এই সময়টা প্রচন্ড বোরিং লেগেছে।

একটা পর্যায়ে তার কার্যকলাপ আর মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করা শুরু করলাম। কিন্তু বাদ সাধলো ১২ বছরের বিচ্ছু একটা চাইনিজ ছেলে। অনেকক্ষণ থেকেই সে ফিক ফিক করে হাসার চেষ্টা করছে, বেচারার মা শক্ত করে তার মুখ চেপে ধরে এতক্ষণ আটকে রেখেছিল।

হঠাৎ গাইডের এক কেরামতিতে সবাই আর্তচিৎকার করে ওঠে। নিজের মা আর বাকিদের ভয় পাওয়া দেখে বদ পিচ্ছি এবার ঘর কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে ওঠে। এতক্ষণে কষ্টে আটকে রাখা আমার হাসিটাও আর আটকানো গেল না। আমাদের এই অভদ্র হাসির ফলেই কিনা জানিনা সেখান থেকে সহসাই মুক্তি পেলাম।

এরপর ভয়ঙ্করতম কয়েদীদের শব্দহীন জেলখানা দেখে তার ইতিহাস এবং অতৃপ্ত আত্মাদের গল্প শুনে ট্যুর শেষ হল। আমার মত যাদের ভূতের ছবি দেখে প্রায়ই হাসি পায়, এই ট্যুর হয়তো তাদের জন্য নয়, তবে আপনি যদি ভয় পেতে ভালোবাসেন তাহলে মিস করা ঠিক হবে না, সেইসাথে ইতিহাসের অনেক কিছুই জানা হবে এখানে।

ফেরার পথে রাস্তায় অনেক সময় লেগে গেল। মূল কারণ এসময়ে রাস্তায় অতিরিক্ত পরিমাণ বুনো প্রাণীর আনাগোনা। অল্প গতিতে অনেক সাবধানে গাড়ি চালাতে হয়। প্রায় প্রতি একশ মিটারেই একটা করে মৃত প্রাণীর দেখা মিলল। কখনো ওয়ালাবি, কখনো পোসাম, কখনো বা ওমব্যাট। যেই তাসমানিয়ান ডেভিলের সাথে দেখা করার এত তীব্র ইচ্ছা ছিল তাকেও দেখলাম একবার রাস্তায়, মৃত। পোর্ট আর্থার এমনিতেই মন ভারি করে রেখেছিল তার উপর এই অবলা প্রাণীগুলোর ছিন্নভিন্ন দেহ মনটাকে কেমন যেন বিষিয়ে দিল।

সভ্যতার নামে তাদের বাড়িতে এসে, তাদের ঘরবাড়ি কেটে রাস্তা শহর বানিয়ে কিভাবে আমরা ধ্বংস করছি সে প্রমাণ তারা মৃত্যু দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে যেন। আজ মনমতো কিছুই দেখতে পারিনি কিন্তু তার জন্য মন খারাপ হয়নি তবুও কিসের যেন চাপা একটা কষ্ট, হাহাকার আর অস্থিরতা নিয়ে ফিরলাম হোবার্ট শহরের পথে।

রাতে ডিনারের দাওয়াত ছিল, শহরে ফেরার পথের উপরেই পড়ে। সিডনির ছোটভাই মেহেদী এখানে চলে এসেছে অনেকদিন হল। নিজে রান্না পারেনা, করেও না তবুও জোর করে দাওয়াত দিয়ে সারাদিন কাজ করে এসে এটা সেটা অনেককিছু রান্না করে রেখেছে। খাবার নয়, তার অসম্ভব আন্তরিক আতিথেতাই যেন মুগ্ধ হয়ে খেলাম। দেশ ছাড়ার পর পরিবারহীন এই ভিনদেশে আর কিছু না পাই অসংখ্য ভাই-বোন পরিবারের ভালোবাসা পেয়েছি। আমি যে অসম্ভব ভাগ্যবান সেটা আরেকবার মনে পড়ে গেল।

হোটেলে ফিরে মনে হল মাটিতেই ঘুমিয়ে যাব। কোনমতে গোসল সেরে বিছানায় পড়েছি। কেন যেন মনে হচ্ছে তাসমানিয়াতে মানুষের ঘুম দিগুণ হয়ে যায়। কারণ আমি জীবনে কোনদিন এতো ঘুমাইনি, তবুও মনে হচ্ছে ঘুম শেষ হচ্ছে না। চোখ বন্ধ করে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবছিলাম এই ভীষণ জরুরী ব্যাপারটা কারো কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

  • ফাহাদ আসমার, সিডিনি, অস্ট্রেলিয়া 

আরও পড়ুন- অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া ডায়েরি; পর্ব ০১

প্রবাস কথা আপনাকে নিয়ে যাবে দুনিয়ার সব প্রান্তে।প্রবাসীদের সব খবর জানতে;প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.