তাসমানিয়ায় লেখক
Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া ভ্রমণ

অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া ডায়েরি; পর্ব ০১

তাসমানিয়া অস্ট্রেলিয়ার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত দ্বীপরাজ্য, উদার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অসাধারণ লীলাভূমি। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরের তাসমানিয়া শুধু যে এ দেশের সর্বদক্ষিণ এলাকা তা নয়, এটা মানব বসতির সর্ব দক্ষিণ প্রান্তের একটি। এই রাজ্যের শেষ প্রান্তে অবস্থিত রাজধানী শহর হোবার্ট’কে তাই অবস্থানগত কারণে পৃথিবীর প্রান্ত বলা যায়।

ছোট বড় প্রায় ৩৩৫টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এ রাজ্যের প্রধান দ্বীপ তাসমানিয়া। আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর ২৬তম। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে ব্যাস প্রণালী দিয়ে বিভাজিত তাসমানিয়ার বর্তমান জনসংখ্যা ৫ লাখ ৩০ হাজারের মতো। যার প্রায় অর্ধেকের বসবাস রাজধানী হোবার্ট শহর এবং এর উপকণ্ঠে। এন্টার্টিকার নিকটবর্তী এ রাজ্য প্রায় সারাবছরই শীতের চাদরে ঢাকা থাকে, গরমে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২০-২৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

তাসমানিয়ায় এখন শীতকাল, অনেক বছর ধরেই প্ল্যান করছিলাম গরমের সময়ে এখানে বেড়াতে আসবো, কিন্তু মাত্র ২-৩ মাসের সেই সময়ে সব হিসেব মিলিয়ে ৯ বছর অস্ট্রেলিয়াতে থেকেও কখনোই আসা হয়নি। প্রতিনিয়ত ওয়েবে চমৎকার সব ছবি দেখি আর ভাবি আর দেরি করা ঠিক হবে না, এবার তাই হঠাৎ যখন সুযোগ পেয়েছি শীতের মাঝেই চলে এসেছি।

এ লেখা যখন লিখছি, তখন বাইরের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস যদিও হোটেল ঘরের চমৎকার হিটিং সিস্টেমের জন্য তা টের পাওয়া যাচ্ছে না। শীত আমার খুব পছন্দের সময়, তাপমাত্রা যাই থাকুক না কেন। শীতের জন্য অবশ্য বেশ ভালো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। আসার আগে দেখলাম এডভেঞ্চার মেগাস্টোর কাঠমান্ডু’তে ৫০% মূল্যছাড় চলছে, ব্যাস আর পায় কে। শীতের কাপড়ের কেনাকাটা দেখলে যে কেউ নিশ্চিত ভাবতো দক্ষিণ মেরু অভিযানে যাচ্ছি।

মোটামুটি বাজেট এয়ারলাইন্স জেটস্টারের টিকেট কাটা ছিল সকাল ছয়টার ফ্লাইটের। আগের রাতে গোছগাছ করতে করতে দেখলাম প্রায় ২টা বাজে, দু’ঘণ্টা পরেই উঠতে হবে তাই আর ঘুমাইনি। এত ভোরেও ঘুম থেকে উঠে ফ্ল্যাটমেট মাহবুব ভাই নিজ উদ্যোগে এয়ারপোর্ট নামিয়ে দিয়ে গেলেন।

অনেক সকাল বলেই সম্ভবত মাত্র ১৫ মিনিটেই চেকিং-বোর্ডিং সেরে সিটে গিয়ে বসলাম। সব যাত্রী সময়মত চলে আসায় ১০ মিনিট আগেই ক্যাপ্টেন টেক অফ করেন। আমরা যখন মাটি ছেড়ে মেঘের উপর চলে এলাম তখন সূর্য উঠি উঠি করছে, কিছুক্ষণ পর মেঘের নিচ থেকে লাল আলো ফেলে সূর্য উঁকি দিল। এমন ম্যাজিকাল মুহুর্ত ধরবো বলে আমিতো সটান জানালার পাশের সিট থেকে ক্যামেরা তাক করে বসে আছি।

একসময় হাত আর ঘাড় দুটোই ব্যাথা হয়ে গেল, তবুও ঠিক সূর্যোদয় দেখা হল না। বিমান তখন সূর্যের বিপরীত দিকে উড়ছে, সূর্য যত উপরে উঠছে আমরাও তত পশ্চিমে যাচ্ছি, তাই প্রায় দেড় ঘণ্টা পর যখন তাসমানিয়ার সীমানায় ঢুকেছি তখন প্রথম সূর্যের দেখা পেলাম। এ যেন ঠিক সূর্যের সাথে ইঁদুর বেড়াল খেলা, বেশ অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই ল্যান্ড করালো ক্যাপ্টেন। ভদ্রলোকের জবাব নেই, এত স্মোথ ল্যান্ডিং শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না। ছোট বিমান, প্রচুর ঝাঁকুনি হবার কথা ছিল অথচ ঠিক কখন ল্যান্ডিংটা হল বুঝতে পারিনি। বিমান থেকে নেমে দেখি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, দৌড়ে টার্মিনালে ঢুকে থমকে গেলাম। এত ছোট টার্মিনাল হবে সেটা ভাবিনি, বাংলাদেশে আমার শহর চাঁদপুরের বাস টার্মিনালটাও সম্ভবত এর চেয়ে বড়।

টার্মিনাল ছোট হলেও অসম্ভব সুন্দর, ছিমছাম। লাগেজ নিতে হবে, সাধারণত বেল্টে আসতে কিছুটা দেরি হয় তাই টার্মিনালের ভেতরেই টয়লেট সেরে একটা কফি নিয়ে বের হয়ে লাগেজ নেয়ার জন্য বেল্টে গিয়ে দেখি সেটা বন্ধ, আসেপাশেও কেউ নেই। ভাবলাম এখনো চালু হয়নি তাই বসে থাকলাম। অনেকক্ষণ পরেও কাউকে না পেয়ে ডেস্কে গিয়ে জানতে পারলাম ল্যান্ড করার ১০ মিনিটের ভেতরেই বেল্ট ক্লিয়ার হয়ে যায়, ব্যাগেজ ডেলিভারিও শেষ।

এই অভিজ্ঞতাও আগে ছিল না। যাই হোক, ব্যাগ নিয়ে পাশেই রেন্ট -এ-কারের কাউন্টারে গিয়ে আগে থেকে বুক দেয়া গাড়ি বুঝে নিলাম। খুব অল্প দামে গাড়ি পেয়ে মনে মনে এতদিনে যতটা না খুশি ছিলাম আনলিমিটেড ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ নিতে গিয়ে, ভাড়ার চেয়ে দিগুণ খরচ করে ততোটাই চুপসে গেলাম, ব্যাটারা ব্যাবসাটা এখানেই করে।

৬ দিনের জন্য কেউই সম্ভবত আনলিমিটেড কভারেজ ছাড়া গাড়ি নেয় না। বাইরে বের হয়ে দেখি চমৎকার রোদ, মেঘ বৃষ্টির চিহ্নও নেই, শুধু তীব্র ঠাণ্ডা বাতাস গালে খোঁচা দিয়ে গেল। সিডনী ফেরত যাচ্ছে এমন এক ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ হল, বাচ্চাদের নিয়ে স্কুল হলিডেতে এসেছিল, হলিডে শেষ তাই ফেরত যাচ্ছে। তার কথা অনুযায়ী আমরা অসম্ভব ভাগ্যবান, গত সপ্তাহে খুব বাজে আবহাওয়া ছিল, সাথে তীব্র শীত। আজ থেকেই নাকি আবহাওয়া ভালো হয়ে গেছে, রোদ উঠেছে।

এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের হোটেলের দূরত্ব মাত্র ১৬ মিনিটের। দুপুর ২টায় চেক ইন অথচ এখন মাত্র সাড়ে আটটা বাজে। চোখ ভেঙ্গে আসছে ঘুম, কি করবো খুঁজে না পেয়ে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। রিভার ডারওয়েন্টের উপর দিয়ে নয়নাভিরাম তাসমান ব্রিজ পার হতেই ঝুপ করে সিটিতে নেমে এলাম।

ছবির মত বাড়িঘর ছাড়িয়ে চোখ চলে গেল অদূরে মাইন্ট ওয়েলিংটনের চূড়ায়, অর্ধেক মেঘে ঢাকা থাকলেও চূড়ায় জমা সাদা বরফ মনে কেমন এক ধরণের স্বর্গীয় আনন্দের জন্ম দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চোখে মুখে মুগ্ধতা নিয়ে হোটেলে হাজির হলাম। রিসেপশানে গিয়ে বলতেই সেখানের ভদ্রমহিলা জানালো, আগের গেস্ট এখনো চেক আউট করেনি, সে বের হলেই দ্রুততম সময়ে রুম রেডি করে দেবে।

কি আর করা, ভদ্রমহিলার পরামর্শ মতো কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরতেই প্রায় পুরো সিটি দেখা শেষ হয়ে গেল। ভাগ্যক্রমে হোটেল পেয়েছি সিটির একদম মাঝখানেই। ১২টা নাগাদ চেক ইন করে জামাকাপড় পাল্টে চলে গেলাম ১০ মিনিট দূরের উপশহর মুনা’তে। কিছুদিন আগে সিডনী থেকে মাইগ্রেট করা প্রিয় বড়বোন আঁখি আপু থাকেন সেখানে, প্রায় দেড় দশক আগে সেই টিএসসিসি’র আবৃত্তি সংগঠন ‘নন্দনকানন’ থেকে পরিচয়।

দুপুরে তাঁর বাসাতেই খেতে হবে এরকম সামরিক নির্দেশিকা আগে থেকেই জারি ছিল। আপুর বাসাটা শহরের একপাশে পাহাড়ের চূড়ায়। ঘরে ঢুকে বিস্ময়ে অভিভূত হবার পালা। পুরো লিভিং রুম কাঁচে ঘেরা, সেখান থেকে নিচে প্রায় ২০০ ডিগ্রী এঙ্গেলে হোবার্ট শহর দেখা যাচ্ছে। বাড়িঘর পার হয়ে সুনীল রিভার ডারওয়েন্ট, তার ওপাশে আবার দীর্ঘ সবুজাভ পাহাড়সারি। অদ্ভুত স্বর্গীয় দৃশ্য।

বাঙালী যেখানেই যাক তাঁর রসনা এবং আতিথেয়তা গল্পকেও হার মানায়, সেটাকে আরো একবার সত্য প্রমাণ করতেই যেন আঁখি আপু টেবিল ভরিয়ে খাঁটি দেশি খাবার আয়োজন করলেন। বহুদিন পর এরকম নিখুঁত দেশীয় স্বাদের রান্না খেলাম, তাই এত বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলেছিলাম যে নিঃশ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিল। চা হাতে জানালার কাঁচের ওপাশে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গিলতে গিলতে জেনে নিলাম তাসমানিয়ার প্রয়োজনীয় সব তথ্য।

খাবার পরে আবার ঘুম জেঁকে ধরলো, বিকেলে হোটেলে ফিরে বিছানায় পড়লাম, তারপর আর কিছু মনে নেই। ভেবেছিলাম ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়ে আবার বের হব, জেগে দেখি রাত ১০টা বাজে। বের হলাম খাবারের খোঁজে, হোটেলের পাশের ম্যাকডোনাল্ডস’টাই পুরো শহরের বলতে গেলে একমাত্র জায়গা যেটা খোলা আছে। কি আর করা, গরিবের শেষ ভরসা।

কথা ছিল, বিকেলে দেখা করবো, কিন্তু এক ঘুম বারোটা বাজিয়ে দিল। তবুও এত রাতে ফোন পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই মেহেদী চলে এল, সেও অল্প কিছুদিন আগে সিডনী থেকে মাইগ্রেট করেছে। কিছুক্ষণ আলাপের পর আগামীকাল রাতের ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়ে সে বিদায় নিল আর আমরা গেলাম অস্ট্রেলিয়াবাসীর আরেক ভরসা সুপারশপ উলিসে বাজার করতে।

আমি সাধারণত কোথাও হোটেল নিলে এপার্টমেন্ট হাউজ নেই। কারণ অবশ্যই একটা ফুল ফাংশনাল কিচেন থাকে এসব রুমে। কোথাও গেলে কয়েকবেলা বাইরে খাবার পর আর খেতে ভালো লাগে না। তাই, কিচেন সুবিধা থাকলে চাইলে অন্তত নিজের ইচ্ছামত টুকটাক রান্না করে খাওয়া যায়, হালকা নাশতা হলেও টানা রেস্টুরেন্টে খাবার চাইতে ভালো।

রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, নুন, পেঁয়াজ, মশলা, ডিম, দুধ সব কিছুই পেয়ে গেলাম উলিসে। ঘরে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বসলাম। খুব ক্লান্ত লাগছে, বিকেলে অনেক ঘুমিয়েছি তবুও প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। চোখ ভারি হয়ে আসছে আজ মনে হচ্ছে এখানেই শেষ করতে হবে।

  • ফাহাদ আসমার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া 

আরও পড়ুন- মালয়েশিয়া থেকে অবৈধদের দেশে ফেরার বিমান ভাড়া কমানোর প্রস্তাব

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.