Featured আমেরিকা ভ্রমণ যুক্তরাষ্ট্র

অবিস্বরণীয় ভ্রমণ কাহিনী; নিউ ইয়র্ক টু ভার্জিনিয়া

এই ভ্রমণ কাহিনী ২০১৪ সালের জুলাই মাসের। নতুন চাকরি পাওয়ার কারণে, আমাকে নিউ ইয়র্ক স্টেট পরিবর্তন করে ভার্জিনিয়া যেতে হবে। একদিকে নতুন চাকরি পাওয়ায় খুব এক্সাইটেড, আরেকদিকে ড্রাইভ করে চারপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে নিউ ইয়র্ক থেকে ভার্জিনিয়া যাওয়া। শ্বশুরের গাড়ি নিয়ে এই প্রথম কোথাও ২৭৪ মাইল দূরত্ব পার হয়ে গন্ত্যব্যে পৌঁছাবো। সেটারও এক ধরণের আনন্দ কাজ করছিলো।

অন্যদিকে নিউ ইয়র্কে এত এত আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ফেলে ভিন্ন পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে হবে ভেবেই খুব কষ্ট লাগছিলো। যদিও প্রথম ছয় মাস মানিয়ে নিতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। মোটামুটি আমারই কলেজের এক কাছের বন্ধুর মাধ্যমে।  স্কাইপের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক থেকে বাসা দেখলাম। সময় স্বল্পতার কারণে বাসা যা দেখেছি তাই পছন্দ হয়েছে। মোটামুটি ফোনে কথাবার্তা বলে বাসাও ঠিক করে ফেললাম।

যাই হোক, এখন আসি ভ্রমণের দিন কি কি ঘটেছে সেই কাহিনী নিয়ে। যেহেতু নতুন পরিবেশ, সেহেতু আব্বা এবং আম্মাকে এক মাসের জন্য নিউ ইয়র্ক রেখে গেলাম। তো, শ্বশুরের দেয়া গাড়িতে আল্লাহ দিলে হোমলেস মানুষদের মত যা যা জিনিসপত্র ঢুকানো যায়, সব ঢুকাইলাম। সামনের দুই সিটে শুধু আমি এবং আমার স্ত্রী। এত ঠাসাঠাসি করে মালপত্র উঠাইছি, যা দেখলে আপনাদের মনে হবে পুরো গাড়ি দশ মাসের প্রেগনেন্ট। আমি যে থার্ড আয়নায় পিছনে কিছু দেখবো তার জন্যও একটু জায়গা ছিল না।

সেহরি খাওয়া শেষ করেই আল্লাহর নাম নিয়ে বিসমিল্লাহ পড়ে জিপিএস অন করে ঠিকানা দিয়েই দেখি ভোর ছয়টায় রওয়ানা দিলে প্রায় দুপুর ২ টায় ভার্জিনিয়ায় পৌঁছাবো। অথচ আমি খেয়ালই করিনি আমার জিপিএস এর সেটিংসে যে টোল রাস্তা এভোয়েড করা সেটা অফ করতে হবে। সে জন্য প্রায় সাড়ে চার ঘন্টার রাস্তা আনুমানিক ৭ ঘন্টার মত দেখাচ্ছিল। অবশ্য সেটা ভার্জিনিয়াতে আসার পর মনে পড়েছে। ততক্ষণে কিছুই করার নেই আফসোস করা ছাড়া।

তো, আমরা ওয়াশিংটন ব্রিজ হয়ে মোটামুটি গল্প করতে করতে অর্ধেক পথ পেরিয়ে এলাম। নিউ ইয়র্ক পেরিয়ে যতই সামনে আসতে থাকি অসম্ভব সুন্দর রাস্তা ঘাট, চারিদিকে সবুজ গাছগাছালি, অনেক সুন্দর হাইওয়ে ধরে আমরা খুব সুন্দরভাবেই যাচ্ছিলাম। নিউ ইয়র্ক পেরিয়ে নিউ জার্সি, নিউ জার্সি টার্নপাইক ধরে দেলওয়ার স্টেট।

কিছুক্ষণ পর দেখি গাড়ি মানুষের মত এক পা ল্যাংড়া হয়ে গেলে যেভাবে চলে ঐভাবে চলছে। গাড়ির চাকা ৭০ মাইল স্পিডে ঘুরলেই আমাকে বাম দিক থেকে ডান দিকে ধাক্কা মারে। আমি তো শরীরে ম্যাসাজ হচ্ছে ভেবে আরামছে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর দেখি টায়ার পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে। আমরা জানতাম গাড়ির একটা চাকার মাথা বেজায় গরম। কিন্তু হ্যাতে যে এই রকম গরম অইবো হেইডা জানা আছিলো না।

কিছুক্ষণ পরেই হাইওয়ের সৌল্ডারে গাড়ি থামিয়ে দেখি- ওহ মাই গড। চাকা ফুইল্লা মেজাজ গরম হইয়া, খালি ধোঁয়া আর ধোঁয়া বাহির হচ্ছে। মনে হয় চাকা থেকে প্রচুর পরিমানে কুয়াশা বের হচ্ছে। পরে গাড়িতে বোতলের পানি থাকায়, ওই পানি চাকার মাথায় ঢালার সাথে সাথেই হ্যাতের মেজাজ কিছুটা কমছে।

ঐদিকে ভার্জিনিয়া পৌঁছে আমাদের এপার্টমেন্টের চাবি নেয়ার জন্য বিকেল ৪ টার মধ্যে উপস্থিত থাকতে হবে। তো তখন একজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করে আশেপাশে একটা গাড়ি ঠিক করানোর দোকান খুঁজে ২ মাইল দূরে গেলাম। পেপবয়েজ হচ্ছে গাড়ি ঠিক করানোর ওয়ার্কশপ।

অনেক মিনতি করে বললাম, আমাদের ১ ঘন্টার মধ্যেই চাকা ঠিক করেই ভার্জিনিয়া পৌঁছাতে হবে। যাই হোক, সে সব কিছু চেক করে বলে সামনের দুই চাকার টায়ার ঠিক করতে হবে, বাকিটারও একই দশা। কি আর করা? ৭০০ থেকে ৮০০ ডলার দিয়ে, ভিক্ষুকের মত দুই ঘন্টার মত বসে থেকে গাড়ি ঠিক করলাম।

আসার সময় অনেক পানি নিয়ে রেখেছি। কিছুক্ষণ গাড়ি চালালে তারপর চাকার মাথায় আবার পানি ঢালি। আবার গাড়ি চালাই, তারপর আবার পানি ঢালি। এই করতে করতে ভার্জিনিয়া এসে মোটামুটি বিকেল ৪.৩০ টায় পৌঁছালাম।

যদিও যে মহিলা আমাকে চাবি দেবে বলছে সে থাকতো একই জায়গায়, সেজন্য দেরি হওয়াতেও সমস্যা হয়নি। রোজার দিন ছিল বিধায় ইফতার সেরেছিলাম আরেক বন্ধুর বাসায়। ওদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।

ভ্রমণ অনেক মজাদার ছিল অর্ধেক পথ। কিন্তু বাঁকি পথ ছিল অনেক টেনশনের। যাই হোক, আমার চাকরিতে জয়েনিং ছিল ঈদের দিন। কষ্টে কইলজা আঁর হাডি খানখান হই গেছে। মানুষ কি সুন্দর করি ঈদ করের!

আর আমি দুনিয়ার কাগজপত্র ফিল আউট করি অফিসে ওরিয়েন্টেশনের দিন। বউ বাসায় একা, আমি অফিসে। পরে বিকেলে এসে দুইজনে ঈদের সেমাই এবং পোলাও কোর্মা খেলাম একসাথে।ওই ঈদ আমার জীবনের এক স্বরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে আজীবন।

নিউ ইয়র্ক থেকে ভার্জিনিয়া যাওয়ার পথে মোটামুটি কয়েকটা ব্রিজ পড়বে। সেগুলো হচ্ছে গোথাল ব্রিজ, ভেরাজানো ব্রিজ, দেলওয়ার মেমোরিয়াল ব্রিজ, মিলার্ড টাইডিংস ব্রিজ, বাল্টিমোর টানেল এবং ড্র ব্রিজ।

  • গোলাম মাহমুদ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.