ইতালী

ইউরোপের কাজ তো আর মায়ের হাতের মোয়া না যে, চাইলাম আর পাইলাম

শেয়ার করুন

সেদিন ছিল ২০ জুন। বাংলাদেশ থেকে ইতালীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।বাবা-মা কেউ চায় না আমি বিদেশ করি।দেশে ভালো থাকার মতো যথেষ্ট ছিল আমার। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা! ইউরোপের ভূত আমার ঘাড়ে।ইউরোপ আমার আসতেই হবে।মা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে।বাবা নির্বাক।তাদের এই কষ্টটার কোন মূল্যই নেই আমার কাছে।তখন আমার কাছে মনে হতো তারা কেউ আমার ভালো চায় না। সবাইকে কাঁদিয়ে রাত ২ টায় বাসা থেকে বের হলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।আমার চোখে তখন রঙীন স্বপ্ন।ইমিগ্রেশন পর্ব শেষ করে কাতার এয়ারে উঠে বসলাম।সময় যাচ্ছে আর স্বপ্ন বড় হচ্ছে।অবশেষে দীর্ঘ ১৭ ঘন্টার জার্নি শেষে রোমা এয়ারপোর্টে এসে ল্যান্ড করে বিমান।তখন বিকেল ৪টা। ইমিগ্রেশন শেষ করে ৫টার দিকে বের হলাম।বাহিরে আমার বড় বোনের হাজব্যান্ড গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে।

গাড়িতে উঠে বসলাম। উদ্দেশ্য বলোনিয়া। আবারও ৬/৭ ঘন্টার দীর্ঘ জার্নি।সূর্য তখনও মাথার উপরে।আমার কাছে খুব অবাক লাগছিলো।রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে আর আমার বিষ্ময়টা বেড়ে চলেছে।হাজার বছরের পুরাতন দেশ অথচ কত সুন্দর পরিপাটি। তখন মাতৃভূমিটাকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো।অবশেষে রাত ১ টার দিকে জার্নির আবসান হলো।সেই রাতে আমার তেমন ঘুম হলো না।৬ টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।আপু নাস্তা দিলো। নাস্তা খেয়ে ছোট ভাগ্নীকে কোলে নিয়ে খেলা করতে লাগলাম।ওর বয়স তখন তিন মাস আর বড় ভাগ্নীর সাত বছর।সকাল দশটার দিকে আমি আর ভাইয়া বের হলাম।মটর সাইকেলে ঘুরতে ভালোই লাগছিলো বলোনিয়ার ওলিতে গলিতে।আমি তখন অবাক দৃষ্টিতে সবকিছু দেখছি।যা দেখি সবই ভালো লাগে।এভাবে কেটে যায় চারটি মাস।বাবা-মার অভাবটা তখনও বুঝতে পারিনি।চার মাস পর এক প্রকার জোর করে চলে আসলাম রোমে।আমার বোন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে।তখন ঠিক মায়ের মুখটা ভেসে উঠলো।আমি তখন মা-বাবার কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারলাম।মা ঠিক এভাবেই কাঁদছিলো সেদিন।যাই হোক আবারও সবাইকে কাঁদিয়ে চলে আসলাম স্বপ্নের নগরে রোম শহরে।

এখানে ক্লিক করুন, লাইক দিন, প্রবাসের সব খবর পৌঁছে যাবে আপনার কাছে

শুরু হলো বেঁচে থাকার এক দীর্ঘ লড়াই। স্বপ্ন নিমেষেই পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে।তখন আমার কাছে ইতালীকে অষ্টতালের দেশ মনে হতে লাগলো।এমন হাহাকার আমি বাংলাদেশেও দেখিনি।কেউ কেউ সিগন্যালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টিস্যু পেপার, লাইটার বিক্রি করছে আবার কেউ কেউ গাড়ির গ্লাস পরিষ্কার করছে।কেউ ফুটপাতে খেলনা, ঘড়ি, চশমা, ব্যাগ বিক্রি করছে।কেউ কেউ আবার বিভিন্ন রেষ্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছে। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, আমার এক রুমমেট মালগুলো রেখে পালানোর চেষ্টা করছে। কারণ, পুলিশ ওদের সবাইকে ধাওয়া করেছে।

রাত অনেক কিন্তু এখনো আমার রুমমেট আসেনি।আমরা সবাই চিন্তায় পড়ে গেলাম।কারণ ও ছিলো অবৈধ।ওর কোন বৈধ কাগজপত্র ছিলো না। আমাদের বাসার বড় ভাই থানায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসেছে, ওকে গ্রেফতার করা হয়নি।অবশেষে রাত দেড়টার দিকে হাসপাতাল থেকে ফোন আসে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে দেয়াল টপকাতে গিয়ে পড়ে পা ভেঙ্গে ফেলেছে।বৈধ কাগজপত্র ছিল না বিধায় ওর চিকিৎসা হয়নি ঠিকমতো।আর এসব দেখে আমার স্বপ্নগুলো মৃত্যুর প্রহর গুনছে।কারণ, আমি অন্য আট-দশজনের মতো পারবো না এভাবে ব্যবসা করতে।আমার দ্বারা হবে না।প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুই বেলা কাজের সন্ধানে বের হই।ইউরোপের কাজ তো আর মায়ের হাতের মোয়া না যে চাইলাম আর পাইলাম। যার কাছে যাই সেই বলে- ‘ইস্, একটা সপ্তাহ আগে আসলে না? ভালো একটা কাজ ছিলো।এখন সেখানে অন্য একজন ঢুকে গেছে।’ সবারই মুখস্থ করা একই বুলি। বাড়িতে ফোন দিলে মা-বাবার কান্না ভালো লাগে না। আবার তাদেরকে বলতেও পারছি না-

‘আমি খুব কষ্টে আছি।আমি ভুল করেছি বাবা। এই মুহূর্তে আমার হাতে এক কাপ কফি খাবার পয়সা নেই, কাজ নেই। কিন্তু প্রতি মাসে আমাকে ৩৫০ ইউরো খরচ করতে হয়।’

বাবা বলতো- ‘টাকা পাঠাইয়া দিতেছি, তুই তারাতারি চলে আয়।’ আমি তাদেরকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বলতাম- ‘আর কিছু দিন দেখি।’ একেকটা দিন তখন আমার কাছে একেকটা মাসের মতো।একটা সময় নিজের কাছে হেরে যাই।সিদ্ধান্ত নেই দেশে ফিরে যাবার।কিন্তু কথায় আছে না যে, রিজিকের মালিক আল্লাহ। হঠাৎ আমার এক বন্ধুর বন্ধু আমাকে ফোন দিয়ে বলে- আগামীকাল ভোর চারটায় বাসার নিচে থাকতে। আমি পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেলাম। দীর্ঘ ১০ মাস পর আমি কাজ পেলাম।আল্লাহ তাআলাকে অশেষ ধন্যবাদ। ভোর চারটায় কাজে গেলাম।শেষ করলাম বিকেল পাচঁটায়। সাপ্তাহে তিন দিন কাজ, মাসে ৪০০ ইউরো বেতন।মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম।কারণ, না খাওয়ার থেকে চিড়া খাওয়া কসা না।

এখানে ক্লিক করুন, লাইক দিন, প্রবাসের সব খবর পৌঁছে যাবে আপনার কাছে

তিন মাস পর আমার নিয়মিত ছয়দিন কাজ ধার্য করা হলো।বেতন ১২০০ ইউরো। কিন্তু শর্ত একটা- প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে বেশি কাজ করতে হবে এবং শনিবার রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করতে হবে।আমি তো মনের আনন্দে কাজে লেগে পড়লাম।মালিক ছিল আমার সমবয়সী। তাই আমার সংগে সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো। বড় অমায়িক ছিলো। কোন হিংসা বা অহংকার ছিলো না ওর মধ্যে।দীর্ঘ তিন বছর কাজ করেছি ওর সংগে।কখনো আমার সংগে খারাপ আচরণ করেনি।এখনো মাঝে মাঝে কথা হয় ওর সংগে।

চলবে—

  • মাহমুদ শাহীন, বলোনিয়া, ইতালী।
শেয়ার করুন

One Reply to “ইউরোপের কাজ তো আর মায়ের হাতের মোয়া না যে, চাইলাম আর পাইলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.