ইউরোপ রঙ্গের দুনিয়া

আইসল্যান্ড; ধনীদের ঘুরে বেড়ানোর দেশ

শেয়ার করুন

ইউরোপের একটি দেশের নাম আইসল্যান্ড ৷ এই দেশটির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট আছে, বাস্তবে এটি একটি দ্বীপ, যার মধ্যে ছিল বা আছে অনেক আগ্নেয়গিরি। ফলে অনেক ঠান্ডার দেশ হলেও তত ঠান্ডা নেই ৷ আইসল্যান্ডের রাজধানীর নাম উচ্চারণ করা কঠিন, তাই আমি বলি রেকাবিক বানান হলো reykjavik. জনগণের সংখা দেড় লাখের কম। গত দশ বছরে ট্যুরিজম ব্যবসা করে দেশটি ভাল টাকা কামিয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মত ইমিগ্রান্ট মানুষ চোখে পরেনি।

আইসল্যান্ড ঘুরে বেড়ানোর জন্য একটি গাড়ি ভাড়া করা উচিত। বেশিরভাগ জায়গাতে গাড়ি পার্কিং ফ্রি ৷ শহরের বাহিরে গাড়ি নিয়ে যাওয়া ভাল, অন্য কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই। বিকল্প ব্যবস্থা হলো প্যাকেজ ট্যুর। সেটাও খারাপ না তবে দাম বেশি। ট্রেন নেই,মেট্রোও নেই।

চলুন দেখে আসি কি কি আছে দেখার মত:-

• Blue Lagoon অবশ্যই যাবেন , এখানে প্রাকৃতিক ভাবেই গরম পানির হ্রদ বা পুকুর, যাওয়া আসার ব্যবস্থা এবং গোসলের টিকিট নিশ্চিত করবেন আগে থেকেই। একদিন সারাদিন লাগবে।
• গোল্ডেন সার্কেল দেখতে যাবেন। একদিন সারা দিন লাগবে।
• আগ্নেয়গিরি এবং এর নিচের জায়গা দেখতে যাবেন। একদিন সারা দিন লাগবে।
• শীতকালে গেলে বরফ নিয়ে নানা দেখার জিনিস আছে।
• শহরের মাঝখান থেকেই বড় নৌকাতে করে তিমি মাছ ও সমুদ্রের পাখি দেখতে যাবার প্যাকেজ ট্যুর পাবেন। ইন্টারনেট থেকে কিনলে দাম কিছুটা কম পাবেন। যত দামি প্যাকেজ কিনবেন তত বেশি সুবিধা পাবেন।
• কিছু ঝর্ণা আছে দেখার মত ৷ কমপক্ষে ১ দিন লাগবে একটি ঝর্ণা দেখতেই(শুধু গরমকালে)
• আপনার অতিরিক্ত টাকা থাকলে কিনতে পারেন হেলিকপ্টার ভ্রমণ বা প্রাইভেট প্লেনে করে আইসল্যান্ড ঘুরে ঘুরে দেখার টিকিট। মূল শহরের নানা জায়গাতে এই টিকিট বিক্রি করে।
• রাজধানীর সবচেয়ে বড় শপিংমল ২ টি হলো , Kringlan (শহরের মধ্যে ১৮০ টি দোকান ) এবং Smáralind (শহর থেকে ৭ কিমি দূরে ১০০ এর কাছাকছি দোকান ) অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করে কেনার মত কিছুই পেলাম না। কারণ ব্রান্ডের যে দোকানগুলি রয়েছে সেগুলিতে যা আছে তার সবই ইউরোপের অন্যান্য শহরে পাওয়া যায় এবং দাম কম। যাদের অনেক টাকা আছে এবং ইউরোপের বাহির থেকে ঘুরতে এসেছে, তারা শুধু এখন থেকে বাজার করতে পারে।
• কবরস্থান নাম, Fossvogskirkjugarður আয়তন মাত্র ২৮.২ হেক্টর !!! প্রতি টি কবর দেয়ার সময় বাধ্যতামূলক ভাবে একটি গাছ লাগাতে হয়। ফলে অসংখ্য গাছে ভর্তি অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। ভালো লাগলো নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছে কুকুর নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। আইসল্যান্ড যদিও খুব নিরাপদ দেশ তবে ভুতেরা কি নিয়ম কানুন মানবে! মনে হতেই আর দেরি করিনি।
• Hallgrímskirkja এটি একটি চার্চ উচ্চতা ২৪৪ ফুট। এটির উপরের রুম থেকে পুরোটা শহর দেখা যায়। দেখার মত, তাই ট্যুরিস্ট এর সংখ্যা কম না। এটি তৈরী করা হয়েছিল শহরের এক প্রান্তে যা থেকে পুরো শহর দেখা যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে শহর অনেক বড় হয়েছে ফলে এখন চার্চটি শহরের একদম মধ্যে খানে অবস্থিত হয়ে গেছে।
• সংসদ ভবনের নাম Alþingi এতো ছোট সংসদ ভবন বিল্ডিং আমি বাপের জন্মেও দেখি নাই। সংসদ সদস্য ৬৩ জন এবং এই বিল্ডিং হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন সংসদ ভবন ! খুবই সাধারণ বিল্ডিং মনে হয়। যাইহোক এটির সামনেই উচা উচা হোটেলের নির্মাণ কাজ চলতেছে। তবে আগে এটি কবরস্থান ছিল তাই ৷ হাড্ডি গুড্ডি পাওয়া গেলে নির্মাণ কাজ থেমে হয়, হাড্ডি গুড্ডি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আবার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এভাবেই চলতেছে এখানকার নির্মাণ প্রক্রিয়া।
• এখানকার বাড়িগুলি নিয়ে কিছু শোনা কথা- পুরাতন সব বাড়ি কাঠ দিয়ে তৈরী। একবার আগুন লেগে অনেক বাড়ি পুড়ে গেছিলো। এছাড়া কাঠের বাড়ির নানা সমস্যা হয়, তাই অনেকেই ইংল্যান্ড থেকে টিন কিনে এনে কাঠের উপর টিন লাগিয়ে দিয়েছে। আবার অনেক বাড়িরই মেঝে মজবুত করার জন্য সিমেন্টের মেঝেও তৈরী করেছে। আবার কিছু ইট পাথরের বাসা তো আছেই। তবে মজার ব্যাপার হলো, প্রায় প্রতিটি বাসা বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের। ফলে দেখতে খুব সুন্দর লাগে।
• Kolaportið . এটি একটি ইনডোর মার্কেট যেখানে খাবার থেকে শুরু করে নানা ঐতিহাসিক সামগ্রী বিক্রি করা হয়। সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী। তবে ঐতিহাসিক বা ঐতির্য্য অনুসারে বানানো নানা খাবার খেলাম ৷ মূলত পাউরুটি বিস্কুট জাতীয়, খেতে বেশ ভালো লাগলো।
• প্রধানমন্ত্রীর বাসা, মূল রাস্তার পাশেই বাসা, কোনো গার্ড নেই। অনেকেই মিউজিয়াম মনে করে ওই বাসাতে ঢুকে যায়!

• স্ট্যাচু Ingólfur Arnarson এটি একটি বিশেষ জায়গা। কারণ এখনই প্রাইড বা গে মানুষদের বিশাল সমাবেশ হয় প্রতি বছর। তখন ওই স্ট্যাচুর ঠোঁটে লিপিস্টিক দেয়া হয়।
• Harpa বিল্ডিং. এটি একটি মার্কেট এবং কনফারেন্স হল। এর ভিতরে একটি সিনেমা হল আছে। তবে এর মূল আকর্ষণ হলো বাহিরের কাঁচ। এতে প্রাকৃতিক ভাবেই নানা আলোর খেলা দেখা যায়। এছাড়াও নানা রকমের কৃত্রিম লাইটের ব্যবস্থা আছে। রাত হলেই নানা আলোর নানা কাঁচ অদ্ভুত সুন্দর। তবে ভিতরের ছাদ টিও দেখার মত। বিল্ডিঙে ঢুকতে এবং টয়লেটে যেতে টাকা লাগে না। এখন থেকে আসল সুভেনিয়র কেনা যায়।
• সূর্যের একটি আলো বা তাপ এবং পৃথিবীর চম্বুক শক্তির সংঘর্ষে আকাশে এক বিশেষ ধরণের আলো তৈরী হয়। এই আলোকে বলা হয় northern lights বা aurora. আইসল্যান্ড হলো এই আলো দেখার জন্য খুব ভালো জায়গা। যদি ভাল করে দেখতে চান তবে ৪ ঘন্টার প্যাকেজ ট্যুর কিনবেন। হোটেল থেকে রাত ৯ টার দিকে বাস এসে নিয়ে যাবে, আলো দেখে ছবি তুলে আবার রাতেই হোটেলে তাদের গাড়িতেই পৌঁছে যাবেন। আর কম টাকায় নিজে দেখতে চাইলে রাতে চলে যাবেন Grótta Island Lighthouse . আর আমার মত অলস আর রাতে যদি বের হতে না চান তবে বিকল্প হলো SAGA মিউজিয়াম। এখানে ওই আলোর উপর ভিত্তি করে নানা কিছু আছে। ঢুকতে কিছু টাকা নিলেও খারাপ লাগবে না, অনেক কিছু জানতে পারবেন।
• স্ট্যাচু নাম Monument to the Unknown Bureaucrat এটি হলো একটি মানুষের মূর্তি যার উপরের দিকে পাথর আর নিচে ব্রিফকেস নিয়ে অফিস যাবার ভঙ্গি। দেখার মত, ছবি তুলে অনেকেই এখানে আমিও তুললাম। এর পাশেই সরকারি ট্যুরিস্ট অফিস। সেখানে পুরো শহরের ম্যাপ রিপ্লিকা ও নানা কিছু আছে। এখান থেকে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারেন।
• ইউরোপের বেশিরভাগ ইন্ডিয়ান নামের রেস্টুরেন্টের মালিক কর্মচারী বাংলাদেশী হয়। আইসল্যান্ড ব্যতিক্রম। গেলাম “বোম্বে বাজার” নামক একটি রেস্টুরেন্টে। ইন্দোনেশিয়া নাকি ফিলিপিন এর লোকজন নিয়ে এই রেস্টুরেন্ট। নিলাম চিকেন কারী , দাম নিলো 3290 ISK. অতি জঘন্য খাবার, টাকা নষ্ট। ইন্ডিয়ান স্ট্রিট ফুড নামের একটি রেস্টুরেন্টে , নাম Hraðlestin তবে গিয়ে আবার হতাশ। বাংলাদেশের নাম গন্ধ নেই। নিলাম “চিকেন থালী” খেতে ভাল লাগলো না। অর্ধেক খেয়ে পুরো দাম দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ইন্ডিয়ান ম্যাংগো নামের আর একটি রেস্টুরেন্ট এর নাম পেয়েছিলাম।তবে সেটিতে আর যাওয়া হয় নাই।
• দুনিয়ার একমাত্র এবং হাস্যকর জায়গা যার নাম “পেনিস মিউজিয়াম” যা ভাবতেছেন আসলে পুরোটা তা না। বিভিন্ন প্রাণীর পেনিসের ছবি ও নানা কিছু আছে। নুড বা সেক্স নিয়ে কিছু নেই। সব বয়সের মানুষ দেখতে যেতে পারে। তিমি মাছের পেনিস ৬ ফুটের বেশি লম্বা। আর কিছু বলতে চাই না!

দরকারি কিছু তথ্য:-

জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসে ভ্রমণ করবেন। হাড়কাঁপানো শীত লাগতে পারে বছরের যে কোনো সময়। তাই সেই প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন। ব্যাকপ্যাক বা বাজেট ট্রাভেলরদের জন্য এই দেশ এ না যাওয়াই ভালো। শুধু আইসল্যান্ড ঘুরার খরচ দিয়ে ইউরোপের অন্য ৩ বা ৪ টি দেশ ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। অন্যান্য দেশের মত আইসল্যান্ডে গুগুল ম্যাপ কাজ করে না। ফলে বাস ট্যাক্সি ইত্যাদি এর সময় ভাড়া, ইত্যাদি দেখা যায় না। উবার নেই। অল্প কিছু ট্যাক্সি আছে। আর লোকাল বাস যোগাযোগ ভাল না বিশেষ করে ছুটির দিন গুলিতে। পৃথিবীর সেরা নিরাপদ দেশ, এর কারণ মনে হয় এদের কাস্টম ইমিগ্রেশন। আমেরিকার থেকেও কঠিন ভাবে পাসপোর্ট ভিসা চেক করে।

দুনিয়ার ধনী শ্রেণীর মানুষ, যাদের নিজস্ব প্লেন আছে। তাদের জন্য রিলাক্স ট্যুরের জায়গা হলো আইসল্যান্ড। শহরের মাঝে ছোট এয়ারপোর্টে এইরকম প্রাইভেট প্লেনের মেলা। হানিমুন করার জন্য ভালো যদি সেই সামর্থ্য থাকে।

শেষকথা, দুই দিনে একটি দেশের কিছুই দেখা সম্ভব না। উপরে লেখাটি আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় লেখা, ফলে তথ্য বিভ্রাট থাকতেই পারে ৷ সেটা খুব স্বাভাবিক।

লেখক-ফরহাদ প্রধান,সুইডেন

শেয়ার করুন

One Reply to “আইসল্যান্ড; ধনীদের ঘুরে বেড়ানোর দেশ

  1. ধনীদের বেড়ানোর দেশ – কথাটা হয়তো সেভাবে ঠিক না। আইসল্যান্ড অনেক এক্সপেন্সিভ, এটা ঠিক, কিন্তু ব্যাকপ্যাকারদের জন্য স্বল্প খরচে ঘুরে বেড়ানোর উপায় ও আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.