ব্লগ স্পেন

ঢাকা থেকে প্যারিস, প্যারিস থেকে বার্সেলোনা; আমার কাজটা হলো খালি মন খারাপ করে রাখা

শেয়ার করুন

ইচ্ছা আর অনিচ্ছাকৃত হানিমুন শেষ করে দিল্লী থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে (ট্রেন) কলকাতা এসে পৌঁছালাম আমরা। যে আগ্রহ আর খুশীটা নিয়ে ইন্ডিয়া গিয়েছিলাম, ফিরে আসার সময় আমার আর সেই খুশী রইলো না। রইলো না এ জন্য যে, আমার আবার ইন্ডিয়া যেতে হবে। একমাস ইন্ডিয়া ঘুরে অতিষ্ট হয়ে গেছি। কলকাতা থেকে দিল্লী, ট্রেনে করে যাওয়ার আগ্রহটা আমার ছিলো বেশী। কারণ যেতে যেতে পুরো কলকাতা দেখবো। যাওয়ার সময় খুব এনজয় করেছি। শহর ছাড়িয়ে গ্রাম, পথ, পশু-পাখি, পেখম মেলা ময়ুর- সব ছিলো ভালোলাগার। ফিরে আসার সময় আর কিচ্ছু দেখতে মন চাইছিলো না। ভাবছিলাম, কখন দেশে যাবো। আর ভাবছিলাম, ফিরে গিয়ে আমার বিয়ের ঘটকের সাথে ক্ষাণিক ঝগড়া করে নেবো।
সব দোষ তার। বিয়ের ঘটক হলো আমার বড় ফুপা। ফুপার ভাতিজা আর আমার হাসব্যান্ড একসাথে বার্সেলোনাতে থাকে, একসাথে তাদের ব্যবসা। ভাতিজা গত বছর দেশে গিয়ে বিয়ে করে আসলো। এ বছর বন্ধুকে পাঠাচ্ছে। পাঠানোর আগে আমার ফুপার সাথে যোগাযোগ করে বলেছে তার বন্ধুর বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে। ফুপা মনে হয় আর কাউকে না পেয়ে আমাকেই পেলো। ফুপা আ তার ভাতিজা কুমিল্লার মানুষ। আমার তখন সারা কুমিল্লার উপর রাগ হচ্ছে। (কুমিল্লার কেউ লেখাটা পড়লে রাগ করবেন না। এখন আর কোন রাগ নেই আমার)।

ফুপুর বাসা কল্যাণপুর। সেখানে গিয়ে ফুপাকে বললাম সব। আমি আর ইন্ডিয়া যাবো না বললাম, একটু রাগও করলাম। ফুপা আমাকে একটু শান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ইন্ডিয়া না গিয়ে যদি পারা যায় সে ব্যবস্থা করা যায় কি না দেখি। আমার ফুপা ছিলেন Ministry of Foreigen Affairs এর Protocol Officer। সেই সুবাদে ফ্রান্স দূতাবাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ লোকের সাথে ভালো পরিচয় ছিলো। আমাকে সেটাই বললেন-‘মন খারাপ করো না মা, দেখি কি করতে পারি’। মনে একটু ভরসা নিয়ে চলে এলাম ঢাকা থেকে আমার মার কাছে।
এরপর আবার তার ফিরে যাবার সময় হয়ে এলো। আবার এলাম ঢাকায়। পাসপোর্ট জমা দিয়ে এলাম ফ্রান্স দূতাবাসে। মনে হয় দু’মাস পরে ডেকেছিলো। গিয়ে ফ্রান্সের ভিসাসহ পাসপোর্ট নিয়ে এলাম। তিন মাসের ভেতর ফ্রান্স যেতে হবে। অর্থাৎ তিন মাসের টুরিস্ট ভিসা পেয়েছিলাম। পুরো তিনটা মাস দেশে রইলাম। বিদেশে গেলে আবার কবে দেশে যেতে পারবো কে জানে! মা আর শ্বাশুড়ীর আদর ছিলো অতিরিক্ত। মা তো মা-ই, শ্বাশুড়ীর আদরটা ছিলো মায়ের মতো। ওদের ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।

ফ্রান্সের টিকেট কাটা হলো। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তখন ফ্রান্সে আসতো, এখনের কথা জানি না। ৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তিন তারিখে আমার ফ্লাইট ছিলো। চার তারিখে ফ্রান্সে এসে পৌঁছালাম। এখানে বলা জরুরী যে, আমার হাজব্যান্ড আগে ফ্রান্সে থাকতো। কাগজ হচ্ছিলো না বলে স্পেন চলে আসে। তার বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধব ফ্রান্সে আছেন। বিমান থেকে নেমে দেখলাম, তারা সব অপেক্ষা করছে। এখন হলো আরেক সমস্যা। আমার তো স্পেনে ঢোকার কোন কাগজই নেই, কিভাবে ঢুকবো! আমি তখন এত কিছু বুঝিওনা। আমার জন্য চিন্তা করার তো একজন আছেই। আমাকে তারা কিছু বলেও না। দুই সপ্তাহ ছিলাম প্যারিসে। ঘুরাঘুরি, দাওয়াত- এ নিয়ে ব্যস্তই ছিলাম।

এখানে ক্লিক করুন, প্রবাস কথার সাথে থাকুন

একদিন তারা আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে প্যারিসের একটা থানায় নিয়ে গেলো। আমার কাজটা হলো খালি মন খারাপ করে রাখা। ভাষা তো জানিনা কিছুই, সব ওরাই বলবে। তার মানে, আমার পাসপোর্ট লস্ট। একটা লস্ট সার্টিফিকেট নেয়া হলো। সেই সময়ে ভিসা ছাড়া ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যেতো না। তো, পাসপোর্ট লস্ট রিপোর্ট নিয়ে দুই সপ্তাহ পর এক সন্ধ্যায় স্পেনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। বর্ডারে কি হতে পারে আমার নূন্যতম ধারণাও ছিলো না। বাসে ওঠার সময় ওরা আমাকে কতকিছু কিনে দিলো- চিপস্, চকলেট, জুস, কোক- তাই খেয়ে দেয়ে আমি ঘুমিয়ে গেলাম। কোথায় বর্ডার, কোথায় কি আমার জানার কি দরকার? প্রতিদিন নাকি বর্ডারে চেক হয়। চেকিং হচ্ছিলোও নাকি বাসের ভেতর, আমি তখন ঘুমে। চেকিং এর পর ও আমাকে ডাকলো। বললো, চেকিং হয়ে গেলো। আমাদের কাছে নাকি আসেইনি। তাই আর লস্ট রিপোর্ট বেরই করতে হয়নি।
তারপর সারারাত বাস জার্নি শেষে পরদিন ভোর বেলায় বার্সেলোনা এসে পৌঁছালাম।

চলবে—

আগের পর্ব: তখন মোবাইল ফোনও ছিলো না যে, মার সাথে একটু কথা বলবো

  • তাহমিনা আক্তার নাহার, বার্সেলোনা, স্পেন।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.