যুক্তরাষ্ট্র

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিরাজ কিছুদিনেই মিলিয়ে গেলো; আগের মতোই কামলা দেয়া শুরু করলো

শেয়ার করুন

নাম- সিরাজুল ইসলাম।
বয়স- যুবক।
শিক্ষা- নাই।
পেশা- দিন মজুর।
বাসস্থান- আমার বাড়ীর এক বাড়ী পর।
সময়- মুক্তিযুদ্ধ ।

এক সকালে গ্রামে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেলো- সিরাজ মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে। ফিসফিসানি হলেও খবরটা বিদ্যুৎ বেগে সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। আনন্দের চেয়ে দু:শ্চিন্তা সবার মনে। এতে বুঝি রাজাকার ও পাকিস্তানীদের এ গ্রামে আসার পথ খুলে গেলো।
তখনকার পরিবেশই ছিল এমন। রাজাকার বুক ফুলিয়ে গর্বিত চলাফেরা করতো আর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এবং তার আশেপাশের বাড়ির মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাতো। যে পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে, তাদের এক একটা রাত কাটতো তীব্র মৃত্যু ভয় নিয়ে। আশেপাশের মানুষের মধ্যেও তা সঞ্চারিত হতো। মৃত্যু ভয় যে কি তা যে সয়েছে সে-ই জানে।

নিজের পরিবারের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে, স্ত্রী-সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে সিরাজ নিজেও মৃত্যু মুখে চলে গেলো।আর কোন খবর নেই। কোথায় আছে, বেঁচে আছে না মরে গেছে- কোন খবর নেই। মুক্তিযোদ্ধারা জানতো, তাদের যুদ্ধে যাওয়া মানে তাদের পরিবারের সবাইকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। তবুও তারা যুদ্ধে গেছে।অনেকে তাদের পরিবারের অন্নের সংস্থান না রেখেই চলে গেছে। বিশেষ করে সিরাজের মত দিন মজুররা।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে দু’একটা সাফল্যের খবর আসা শুরু হলো। এ সময়ে সিরাজের বাড়ির সামনে এক রাজাকারের গলাকাটা লাশ পাওয়া গেলো। সিরাজের পরিবারের আতংক আরও বেড়ে গেলো। সারাদিন লাশ ওখানেই পড়ে রইলো। ঘৃণার চেয়ে ভয়ে কেউ লাশ সৎকারে এগিয়ে আসেনি। সন্ধ্যার আগে সিরাজের অশিক্ষিত দিনমজুর বাবা নিজের জমির এক কোনে নিজেই শরিয়ত মতো লাশটা কবর দিলো। মুক্তিযোদ্ধার মাটিতে রাজাকারের ঠাঁই হলো।

সিরাজ ফিরে এলো দেশ স্বাধীন করে। এ খবরও বিদ্যুৎ বেগে ছড়িয়ে গেলো। সিরাজ ফিরে আসবে এ আশা কারো ছিলো না। খবর পেয়েই ছুটলাম। মুক্তিযোদ্ধা দেখবো। ছোট ছিলাম বলে কেউ জায়গা দিচ্ছিলো না। সবাই তাকে ঘিরে আছে। একবার চোর দেখতে গিয়ে সাধারণ মানুষ দেখে নিরাশ হয়েছিলাম। আজও মুক্তিযোদ্ধা দেখে নিরাশ হলাম। সিরাজ লুঙ্গি, গেঞ্জি পরা সাধারণ একজন মানুষ। সবার কথার উত্তরে সরল মোলায়েম হাসি। এমন মানুষ মুক্তিযোদ্ধা হয় কি করে !
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিরাজ কিছুদিনের মধ্যেই মিলিয়ে গেলো। সে আগের মতোই কামলা দেয়া শুরু করলো। সবার কাছে সে নিতান্তই একজন দিনমজুর। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর বাড়তি কোন পরিচিতি রইলো না।

সিরাজ ভাইকে কখনো যুদ্ধের গল্প করতে শুনিনি। কোন বীরগাঁথা বর্ণনা করতে শুনিনি। আমি বড় হয়ে জানার চেষ্টা করেছিলাম।হেসে এড়িয়ে গেছেন। মনে প্রশ্ন জেগেছিল, সত্যিই কি তিনি যুদ্ধ করেছিলেন !!

এখানে ক্লিক করুন, লাইক দিন, প্রবাসের সব খবর পৌঁছে যাবে আপনার কাছে

মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শোনার আগ্রহ আমার সারা জীবনের। কলেজে পড়ার কোন এক সময়ে গ্রামের চা দোকানের বাইরের বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছি। ভেতরে কেউ একজন যুদ্ধের গল্প করছে। আগ্রহী হয়ে উঠলাম। ভেতরে গিয়ে কথা বসলাম। সেও একজন খেটে খাওয়া মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধা। তার কাছে সিরাজ ভাই সম্পর্কে জেনে আশ্চর্য হলাম। সিরাজ ভাই অনেকগুলো বড় বড় অপারেশনে সাহসী অংশ নিয়েছিলেন। ফেনীর বেলুনিয়ায় খুব বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছিলো।সেখানে সিরাজ ভাই আধা খেয়ে, আধা ঘুমিয়ে তিন দিন যুদ্ধ করেছিলেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে একটা মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়া হয়েছিলো।তিনি সেটা গোল করে খড়ের চালে গুঁজে রেখে দিলেন।যত্ন করে রাখার মত গুরুত্ব তিনি হয়তো অনুভব করেননি।

আমি এখনো অবাক হয়ে ভাবি, দেশের কিছু শিক্ষিত মানুষ কি করে অন্য জাতির সমর্থনে নিজের জাতির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলো, কি করে সিরাজ ভাইয়ের মত নিরীহ, সহজ-সরল অশিক্ষিত মানুষ জাতির পক্ষে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।কিসের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের তোয়াক্কা না করে দেশ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন, যা অনেক শিক্ষিত মানুষও পারেনি।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সিরাজ ভাই মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন পেয়েছেন। কিছু জমি পেয়েছেন, ভাতা পান। নিজের জমিতে একটা মসজিদ করেছেন।বেঁচে আছেন, ভাল আছেন।

  • শেখ ফরহাদ, নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.