মিশর

মিশরে গিয়ে সাড়ে তিন বছরের সন্তান রেখে পালিয়ে গেছে এক বাংলাদেশী নারী; সন্তানকে নিয়ে অথৈ সাগরে বাবা

শেয়ার করুন

ঢাকায় স্বচ্ছল ব্যবসায়ী ছিলেন। মাস তিনেক আগে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে মিশরে ঘুরতে যান পারভেজ। মিশরে গিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটির লোকজনের সাথে কথা বলে পারভেজের মনে হয়, সেখানে ব্যবসা করে ভালোভাবে চলার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো- মেয়েটা বড় হচ্ছে, মিশরে মেয়েটাকে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করানো যাবে। এমন সম্ভাবনা দেখে দেশে ফিরলেন পারভেজ। এসে স্ত্রীকে সবকিছু খুলে বললেন। স্ত্রী সবকিছু শুনে মিশরে যেতে রাজি হয়ে গেলেন। এরপর কোরবানি ঈদের সপ্তাহখানেক আগে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আবার ট্যুরিস্ট ভিসায় মিশরে গেলেন তিনি। এবারের পরিকল্পনা সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া আর ব্যবসা করা।

মিশরে গিয়ে কায়রোর পাশে বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা আল মার্গে বাসা নিলেন পারভেজ। এবার তার পরিচয় হলো তায়েব আলী নামের এক ব্যক্তির সাথে। পরিচয় হলো নিজাম, সুমন, রিয়াদ আর আজিজদের সাথে। এই তায়েবের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ অনেক অপরাধ এবং অপকর্মের অভিযোগ আছে। তায়েব আলীর সাথে পারভেজের বেশ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পারভেজ বলছেন, একসাথে ব্যবসা করারও পরিকল্পনা হয় তাদের।

‘তায়েব আলী আমাকে ২ দিন বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায়। আমাকে বলে, আপনি তো ইনভেস্ট করবেন। এখন সেটা কইরেন না। আমাকে ডলার দেন, আমি আপনাকে ব্যবসা দিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করে প্রায় ১০০০ ডলার দেই তাকে। আমি তার বাসার কাছেই বাসা নেই। তায়েব আলীর ভাগ্নের নাম আজাদ উল্লাহ মুবীন। তারা দু’জন মিলে আমাকে ব্যবসায় সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।’

এবারের যাত্রায় কিছুদিন থাকার পর চিকিৎসার জন্য সেপ্টেম্বরে আবার দেশে ফিরলেন পারভেজ। স্ত্রী আর সাড়ে ৩ বছরের সন্তানের দায়িত্ব দিয়ে এলেন তায়েব আলী আর তার ভাগ্নে মুবীনের কাছে। এটুকু বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন পারভেজ।

‘ভাই, বাচ্চা কান্না করতেছে…২ দিন ধরে কিছু খায় না। শুধু আম্মুর জন্য কান্নাকাটি করে। বাপে আর মেয়ে শুধু কান্নার উপরে আছি।’

সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে এটুকু বলে আবার পুরো ঘটনা বলা শুরু করলেন পারভেজ। জানালেন, বাংলাদেশে ফেরার পর মিশরের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তার। কারণ, তার সিঙ্গেল এন্ট্রি ট্যুরিস্ট ভিসা ছিল। আবার ট্যুরিস্ট ভিসা মিশরে ফিরতে ফিরতে নভেম্বরের ৫ তারিখ হয়ে যায়। কিন্তু মিশরে ফেরার পর বুঝতে পারলেন তার স্ত্রী অনেকটা বদলে গেছে। কথায় কথায় পারভেজ জানলেন, তায়েব আলী আর মুবীন মিলে তার স্ত্রীকে বুঝিয়েছে যে- পারভেজ দেশে আরেকটা বিয়ে করেছে, আর ফিরবে না।

ফেসবুকে থাকুন প্রবাস কথার সাথে

বাংলাদেশের ব্যবসা গুটিয়ে, জায়গা বিক্রি করে সব সম্বল নিয়ে মিশরে বসবাসের জন্য গিয়েছিলেন পারভেজ। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে আবার দেশে ফেরার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করলেন তিনি। কারণ, তিনি বুঝেছিলেন তায়েব আলীকে দেয়া টাকা তিনি আর ফেরত পাবেন না। আর যা আছে তাই নিয়ে ফিরতে পারলেই বাঁচা। গতকাল রোববার (২৭ নভেম্বর) সপরিবারে আবার দেশে ফেরার জন্য টিকেট বুকিং দিলেন পারভেজ। বৃহষ্পতিবার রাতে তারা ঘুমোলেন। কিন্তু শুক্রবার সকালে উঠে দেখলেন তার দুনিয়া বদলে গেছে।

‘বৃহষ্পতিবার রাতে ঘুমাইছি। ব্যক্তিগত ব্যাগে টাকা-পয়সা, স্বর্ণ সব আছে। শুক্রবার ১১ টার দিক ঘুম থেকে উঠে দেখি দরজা খোলা। বাচ্চা বসে আছে। বাচ্চা বলছে, আম্মু বাইরে গেছে চকলেট আনতে। কিন্তু সময়ে বাড়তে লাগলো, সে আর ফিরলো না। একজন বললো- দুইজন গাড়ি নিয়ে এসেছিলো। ঐ গাড়িতে করে চলে গেছে। ভেতরে ঢুকে ব্যাগ চেক করে দেখি ১০ হাজারেরও বেশি ডলার এবং ৭ ভরি স্বর্ণ, কিছু নেই।’

এ কথা বলে আবার কান্না শুরু করলেন পারভেজ।

‘আমার বাচ্চা শুধু আম্মু আম্মু বলে কান্না করছে। মার্গে যারা থাকে তারা বেশিরভাগই অবৈধ ব্যবসা করে। ওরা আমার সোনার সংসারটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। এই দেশে এসে আমার জীবনটা সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গেলো। এখন আমি কি করবো আমি নিজেও জানি না। বাচ্চা শুধু কান্নাকাটি করে। দূতাবাসে ফোন করলাম, একজন কোন পাত্তা দিলো না। আরেকজন ম্যাডাম আশ্বাস দিয়েছেন।’

ফেসবুকে থাকুন প্রবাস কথার সাথে

পারভেজ মিশরে থেকে কাপড়ের ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, মিশরে সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করালে সেখানে থাকার ভিসা পাওয়া যায়। পারভেজের মেয়ে সেখানকার নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়বে এবং তিনি ব্যবসা করবেন- এটাই তার স্বপ্ন ছিল।

‘আমার জীবনের শেষ সম্বলও নিয়ে চলে গেছে। চলার মতো টাকাও নাই, বাচ্চাকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি ভাই।’

পারভেজদের বিয়ে হয়েছিল ২০১২ সালে। ৪ বছরের সংসার ধ্বংস করে অর্থের লোভে তার স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তায়েব আলীর আর তার ভাতিজা মুবীনের- এটা নিশ্চিত পারভেজ। এমনকি তাদের অপকর্মের কথা সেখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটির সবাই জানে। পারভেজ জানতে পেরেছে, তার স্ত্রীকে মুবীনের সাথে দিয়ে উধাও হয়ে গেছে তায়েব আলী। এ ব্যাপারে প্রবাস কথার সাথে ফোনে কথা হয় মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি জুবাইদা মান্নানের সাথে। তিনি বললেন, এর আগে এমন ধরণের ঘটনার মুখোমুখি তারা হননি। তাই কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন। তবে পারভেজকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জুবাইদা মান্নান।

‘এ ব্যাপারে স্থানীয় থানায় জিডি করা হয়েছে। আমরাও দূতাবাস থেকে থানাকে একটা চিঠি দিচ্ছি। তায়েব আলীর সহযোগিতায় মুবীনই তার স্ত্রীকে নিয়ে গেছে বলে নিশ্চিত পারভেজ। এ ঘটনার পরপরই তায়েব আলী দেশে চলে গেছে আর মুবীন ফোন ধরছে না। এখানকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আমরা চেষ্টা করছি মা’কে ফিরিয়ে আনার জন্য। কারণ, মাত্র সাড়ে ৩ বছরের বাচ্চাটা খুব কষ্ট পাচ্ছে।’

Special Correspondent

শেয়ার করুন

২ Replies to “মিশরে গিয়ে সাড়ে তিন বছরের সন্তান রেখে পালিয়ে গেছে এক বাংলাদেশী নারী; সন্তানকে নিয়ে অথৈ সাগরে বাবা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.