মিশর

মিশরীয়দের বাংলাদেশী সবজি খাওয়া শেখালেন আলমগীর

মিশরে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের মধ্যে আলমগীর হোসেনের পরিচয়টা একটু ভিন্নভাবেই দেয়া যায়। তিনি মিশরে বাংলাদেশী সবজি চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। সাফল্য বলতে বাংলাদেশী সবজির বাম্পার ফলন হয় তার ক্ষেতে। তার উৎপাদিত সবজি এখন মিশরের চেইন শপ থেকে শুরু করে বড় বড় মার্কেট, এমনকি খোলা বাজারেও পাওয়া যায়। আর বর্তমানে মিশরীয়দের খাবারে সবজির তালিকায় এশিয়ার ভেজিটেবল সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর হিসেবে স্থান করে নিয়েছে বলেই আলমগীরের উৎপাদিত বাংলাদেশী সবজির অনেক কদর। সবজি চাষ করে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনের গল্প জানতে চায় প্রবাস কথা।

আলমগীরের সাথে কথা বলে জানা গেলো, শুরুটা তিনি করেছিলেন ২০১১ সাল থেকে। কায়রো শহরের পূর্বে কাত্তানীয় এলাকায় সপরিবার তার বসবাস। একদিন সকালে তাজা মাছ কিনতে মনিব নামের বাজারে যেতে ইচ্ছে হলো তার। আর মাছের বাজার যেতে হলে নীলনদের এর উপর দিয়ে যেতে হবে। তারপর?

‘গাড়িতে করে আমি যখন নীলনদের উপর দিয়ে যাচ্ছি, তখন নীলনদের মাঝখানে কিছু ছোট ছোট ঘর ও ফসলে ভরা জমিগুলো দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে দেখার ইচ্ছে হলো। অন্য একদিন আসার পরিকল্পনা করলাম। পরের সপ্তাহে ঠিকই চলে গেলাম নীলনদের পাড়ে। নদের মাঝে যাওয়ার জন্য নৌকায় করে যেতে হবে ভেবে প্রথমে ভয় পেলাম। আবার মনে অনেক আনন্দও পাচ্ছিলাম। অনেক মিশরীয় এই পরিবেশে অচেনা মুখ দেখে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে আর নিজেদের মধ্যে কি জানি বলাবলি করতে লাগলো। যাই হোক, নদের মাঝামাঝি জায়গায় একজন আমার পাশে এসে বললো- ‘আইজ ওগরা নুছ গিনী’। অর্থাৎ ৫০ পয়সা ভাড়া দাও। আমিও ভাড়া পরিশোধ করে সবার সাথে নেমে পড়লাম। মন ভরে দেখছিলাম কালো মাটির সবুজ ফসলগুলো। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখতে পেলাম ৫০/৬০ বছর বয়সের এক বৃদ্ধ আলু  তুলছিলেন। কাছে গিয়ে সালাম দিলাম। সালাম আদান প্রদান হলো। সেই বৃদ্ধ ভদ্র লোকটিকে আমি বললাম, ‘আপনার কি নিজের জমি আছে নীলে…?’ লোকটি হাসতে হাসতে বলতে লাগলো, ‘এই নীলনদের মাঝখান থেকে ঐ দূর পযন্ত প্রায় দুইশো একর জমি আমার’।’

তারপর আলমগীর হোসেন ঐ বৃদ্ধের কাছ থেকে এক টুকরো জমি ভাড়া চাইলেন। লোকটি অবাক হয়ে জমি নেয়ার কারণ জানতে চাইলেন। আলমগীর তাকে জানালেন, নীলনদের এই জায়গাটাতে বাংলাদেশী সবজি চাষ করবেন তিনি। তারপরের গল্পটা আবার আলমগীর হোসেনের মুখ থেকেই শোনা যাক।

‘আমার এমন পরিকল্পনার কথা শুনে তিনি আগ্রহের সাথেই রাজি হলেন। এক কাঠা পরিমাণ জমি নিলাম। জমি ভাড়া এক বছরের জন্য মাত্র  ৫০০ পাউন্ড (মিশরীয় টাকা)। বাংলাদেশী টাকায় চার হাজার টাকা। ঐদিনই আমি জামির টাকা পরিশোধ করে দিলাম। তাকে বললাম, আপনি জমি পরিষ্কার করে চাষ দিয়ে রাখবেন, আমি পাঁচ দিন পর এসে বীজ ফেলবো। আমার কথা মতো লোকটিও সব কাজ করে রাখেন। পাঁচ দিন পর গিয়ে আমি জমিতে প্রথম লালশাকের বীজ বুনি এবং পানি দেই। তার ১৫/২০ দিন পর দেখলাম, লালশাক মাটির উপরে উঠে আসছে অল্প অল্প করে। আরও ২০/২৫ দিন পর লালশাক দেখার মতো বড় হলো। এরপর আমার বাসার আশেপাশের সব বাঙ্গালীদের বললাম। কিন্তু কেউ মিশরের মাটিতে আমার জমি চাষ করার বিষয়টি ভালোভাবে নিলেন না। সবাই অন্য দিক দেখলেন। আমার মনটা নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না, চালিয়ে গেলাম। আবার জমিতে গেলাম এবং লালশাক তুলে বাংলাদেশী, মিশরীয় সবাইকে বিনামূল্যে দিতে লাগলাম। এভাবে অনেক দিন দিতে থাকলাম। তারপর থেকে বাংলাদেশী, ভারতীয় ও কিছু মিশরীয় আমাকে চাষাবাদ করার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুললো। আমিও মনযোগ দিয়ে সবজি কাজ শুরু করি। কিন্তু কিছুদিন যাবার পর বুঝলাম শুধু বাঙ্গালী এবং ভারতীয়দের মাধ্যমে এটার প্রসার সম্ভব নয়। ভাবলাম, মিশরীয়দের আমার সবজি খাওয়া শেখাতে হবে। তাই আমি আমার এক মিশরীয় বন্ধুর সাথে এশিয়ার অর্থাৎ বাংলাদেশের সবজি বাজারজাত করার ব্যাপারে পরামর্শ করি। সে যথেষ্ট সাহায্য করে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে অনেক লোকসান গুনতে হয়। ঠিক তখনই আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন মিশরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং কাউন্সিলর। পরামর্শ দেন কিভাবে মিশরের বড় বড় সুপার চেইনশপ ও মলগুলোতে সরবরাহ করতে হবে। তাদের পরামর্শে আমি এগিয়ে যেতে থাকলাম। তারপর কিছুদিন যেতে না যেতে, আমার বাংলাদেশী সবজির চাহিদা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। তখন আমি আরও জমি নিতে শুরু করি এবং উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেই।

বর্তমানে আমার ফসলি জমির পরিমাণ ১০০ একরের উপরে। নীলনদের মাঝখানে আমার জমিতে লালশাক, করলা, লাউ , পুইশাক, ডাটা, কচু, বড়বটি, চিচিঙ্গা, পটল, বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ী সিম থেকে শুরু করে আরো অনেক সবজি চাষ হয়। বাংলাদেমীদের কাছে প্রতি কেজি সবজি বিক্রি করি বিশ থেকে পঞ্চাশ টাকায় (মিশরীয় পাউন্ড) এবং সুপার চেইনশপ ও  মলগুলোতে পাইকারি বিক্রি করি চল্লিশ থেকে ষাট পাউন্ড করে। এভাবে প্রতিদিন বিশ থেকে পঞ্চাশ মণ বাংলাদেশী সবজি বাজারজাত করতে হয়। মিশরে আমার এই চাষাবাদ দেখে এখন অনেক বাংলাদেশীও চাষাবাদ শুরু করেছেন এখানে। এখানকার খুচরা বাজারে সবজির চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ হয় বাংলাদেশী সবজি দিয়ে।’

Special Correspondent

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.