মিশর

বিদেশে যাচ্ছেন? আগেই জেনে নিন সবকিছু, না হলে আপনার স্বপ্ন চুরি হয়ে যাবে

ঢাকার একটি ছোট্ট মাদ্রাসায় ‘হেফজ’ (পবিত্র কুর’আন মুখস্ত করণ) শেষ করলো রায়হান (ছদ্মনাম)।ওখানে পড়া অবস্থায় রায়হান স্বপ্ন দেখতো হেফজ শেষ করে মিশরে অবস্থিত বিশ্বের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় আল আযহার অথবা সৌদি আরবের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ইসলামিক স্কলার হবে।সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্নজনের সাথে সে যোগাযোগ করতো।

অবশেষে সে একজনকে পেয়ে গেলো তার স্বপ্ন পূরনের জন্য। ঐ মাদ্রাসায়ই পড়ে আসা বাবুল (ছদ্মনাম) যে মিশরে টুরিস্ট ভিসায় এসে কাজে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সহজে ভিসা পাওয়ার জন্য আল আযহারের একেবারে প্রাথমিক লেভেলে ভর্তি হয়ে থাকলো যেন সহজেই স্টাডি’র উদ্দেশ্যে ভিসা নিতে পারে। বাবুল তখন থেকে নিজেকে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট পরিচয় দিতো। রায়হান তার সাথে যোগাযোগ করলে সে তাকে মিশরে আনবে বলে আশ্বস্ত করলো এবং মিশর থেকে তার জন্য ভিসা প্রোসেসিং করার ব্যাপারেও তাকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলো।

রায়হান খুশিতে আত্মহারা, তার স্বপ্ন পূরনের রাস্তা সে পেয়ে গেছে! বাবা-মাকে সে জানিয়ে দিলো। বাবা মাও সম্মতি দিলেন। বাবুল মিশর থেকে রায়হানের সাথে যোগাযোগ করে নিয়মিত এবং মিশর ও আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে সত্য মিথ্যা অনেক তথ্য তাকে দেয়। বাবুল তাকে সব কাগজপত্র রেডি করতে বলে এবং সাথে ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা লাগবে বলে জানায়। মিশরে আসার পর তার আর কোন খরচ লাগবে না। বরং মিশর সরকার তাকে উল্টো খরচ দেবে এমন প্রতিশ্রুতিও পেলো রায়হান। সরল মরে সব বিশ্বাস করে সে।

রায়হান ঢাকায় মিশরের দূতাবাসে যায় ভিসার জন্য। বাবুল তার একজন আত্মীয়র মাধ্যমে টুরিস্ট ভিসার ব্যবস্থা করে। উল্লেখ্য মিশর দূতাবাস ভিসা বাবাদ ৪/৫ হাজার টাকা নিলেও, রায়হানের কাছ থেকে ভিসা এবং বিমান টিকেট বাবদ নেয়া হয় ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা।

রায়হান ভিসা পেয়ে মিশরে আসে। আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে, নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে। কিন্তু মিশরে পৌঁছার সাথে সাথে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরে।তাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে বাবুল ও রায়হানের পূর্ব পরিচিত একজন যায়। ঐখানে বাবুল দাবি করে তাকে এয়ারপোর্ট থেকে বের করার জন্য নাকি আরো ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, সেটাও তাকে দিতে হয়েছে। যদিও রায়হান এয়ারপোর্ট পুলিশকে ২০০ ডলার দিয়ে নিজেই বের হয়ে এসেছে।কিন্তু বাবুলকেও তার দাবি অনুযায়ী আরো ৪০ হাজার দিতে হলো।যাই হোক, রায়হান সব মেনে নিলো তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য।

রায়হান মিশরে এসে যখন আযহারে ভর্তি হতে চায়, তখন বাবুল বলে ভর্তি হতে ২০/৩০ হাজার টাকা লাগবে এবং প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। রায়হান এ কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়, হতাশ হয়ে পড়ে। এখন সে এত টাকা কোথা থেকে ব্যবস্থা করবে? বাবুল তো তাকে বলেছিলো কোন টাকা লাগবে না, উল্টো সে টাকা পাবে। তার উপর সে ইতিমধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা খরচ করে ফেলেছে। সেই সময় রায়হানের বাবাও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। প্রতিদিন তার বাবার পেছনে কয়েক হাজার টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ হচ্ছে। সেই মুহুর্তে আবার তাকে পড়তে হলে এত টাকা লাগবে? সে হতাশ হয়ে যায়।

রায়হানের পরিচিত, যে তাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে যায় রায়হান তার কাছেই ওঠে।সে একটা ফ্যাক্টরীতে কাজ করতো। সে জানতো না আযহারে কিভাবে ভর্তি হওয়া যায় বা আসলে মাসে কেমন খরচ হয়। তাদের মিশরে ঐ রকম পরিচিতও আর কেউ ছিলো না যাদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পেতে পারতো।অতঃপর বাধ্য হয়েই রায়হান ১৭ বছরের একটি কিশোর হয়েও ঐ ফ্যাক্টরীতে কাজে যোগ দেয়।তার মা-বাবা আজো জানে না যে, তাদের আদরের সন্তান পড়ার জন্য এসে এখানে শ্রমিক হয়ে কাজ করছে।

আমি কোন এক কাজে ঐ ফ্যাক্টরীর শ্রমিকরা যেখানে থাকেন সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে পরিচয় হয় রায়হানের সাথে। তাকে দেখেই বললাম, আপনি এত ছোট বয়সে কাজ করতে আসলেন কেন? চেহারা দেখেও মনে হয় না খুব অভাবী পরিবারের সন্তান। পরে সে আমাকে বললো-

‘সাঈদ ভাই, আমি আসলে কাজ করতে আসি নাই।পড়তে আসছিলাম।’

আমি চমকে গেলাম।

‘পড়তে আসলে তো আপনার এখানে থাকার কথা না?

সে আমার কাছ থেকে সময় নিলো এবং আমার সাথে দেখার জন্য পরে একদিন আমার হলে আসলো। প্রথমে সে আমাকে তার সাথে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা আমাকে বলতে চায়নি। কিন্তু আমি বললাম-

‘আপনাকে সহযোগিতা করতে হলে তো আমাকে আগে সবকিছু জানতে হবে। আপনি কেন এসেছেন? কিভাবে এসেছেন? ঐ ফ্যাক্টরির শ্রমিকই বা হলেন কিভাবে? ইত্যাদি।’

পরে সে আমাকে সবকিছু বললো। রায়হানের স্বপ্নটা চুরি হয়ে গিয়েছিলো। আমরা চেষ্টা করছি তার স্বপ্ন যেন আবার তার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি।আপনাদের সাথে এই ঘটনা শেয়ার করার উদ্দেশ্য হলো- বিদেশে যাওয়ার আগে বা আপনার পরিচিত কাউকে বিদেশে পাঠানোর আগে সবকিছু নিশ্চিত হয়ে খোঁজখবর নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিন। তা না হলে এই রকম রায়হানদের স্বপ্ন চোর দিন দিন বাড়তেই থাকবে।

  • আবু সাঈদ মাহমুদ, কায়রো, মিশর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.