মিশর

পিরামিড; হাজার হাজার বছরের রহস্যের নাম

শেয়ার করুন

পিরামিড পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি।পিরামিডের কোন দেশের কথা যদি কেউ জানতে চায় তাহলে প্রথমে বলা যায় মিশরের কথা।ইংরেজিতে ইজিপ্ট (EGYPT) যা আরবীতে (مصر) মিশর। এই দেশটি নীলনদ, পিরামিড, সমুদ্র সৈকত, মরুভূমি, প্রাচীন সভ্যতা ও তাদের রাজা বাদশাদের মমির জন্য বিখ্যাত।

প্রাচীন মিশর শাসন করতেন ফারাও রাজারা।তাদের কবরের উপর নির্মিত সমাধি মন্দিরগুলোই পিরামিড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।মিসরে ছোট বড় ৭৫টি পিরামিড আছে।সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষনীয় পিরামিডটি কায়রোর নিকটবর্তী গিজায় অবস্হিত।এটি খুফু’র পিরামিড হিসেবে পরিচিত।

এটি তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০০ বছর আগে।এর উচ্চতা প্রায় ৪৮১ ফুট।এটি ৭৫৫ বর্গফুট জমির উপর স্থাপিত।এটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল ২০ বছর এবং শ্রমিক খেটেছিল ১ লাখ।পিরামিডটি তৈরি করা হয়েছিল বিশাল বিশাল পাথর খন্ড দিয়ে।পাথরখন্ডের এক একটির ওজন ছিল প্রায় ৬০ টন আর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ থেকে ৪০ ফুটের মতো।এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল দূর-দূরান্তের পাহাড় থেকে। পাথরের সাথে পাথর জোড়া দিয়ে এমনভাবে পিরামিড তৈরি করা হতো যে, একটি পাথর থেকে আরেকটি পাথরের মাঝের অংশে একচুলও ফাঁক থাকতো না।

আজকের আধুনিক বিজ্ঞানীদের কাছেও পিরামিড এক অজানা রহস্য। এর কাঠামো আধুনিক বিজ্ঞানের সব শাখায়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এমন স্থাপত্য কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে যে, এ ধরনের কাঠামো সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প প্রতিরোধক এবং স্থায়ী হয়ে থাকে।

সম্প্রতি দেখা গেছে, পিরাপিড আসলে একটা রেশনাল স্ট্রাকচার।বিশাল সব পাথর কেমন করে শত শত ফুট উপরে তোলা হয়েছিল জানে না কেউ। জানে না কেমন করে কাঁটা হয়েছিল পাথরগুলো। কারণ, পাথরগুলোর ধার এতই মসৃণ যে, অতি উন্নত যন্ত্র ছাড়া যেটা সম্ভব নয়।এখানেই শেষ নয়, মৃতদেহকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় মমি করে রাখতো।এ কাজে তারা বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতো।কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা এখনো ধরতে পারেননি তাদের সেই পদ্ধতি।

পিরামিডের গঠনশৈলীর প্রভাব পৃথিবীব্যাপী।আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মানুষের তুলনায় অস্বাভাবিক রকম বড় পাথরগুলো কিভাবে এত উপরে তোলা হয়েছিল, আধুনিক যুগের মানুষের কাছে এটা খুব বড় একটা রহস্য।সাধারণ রাস্তার উপর দিয়ে কোন গাড়ি বা যন্ত্র ছাড়া এত বড় পাথর টেনে আনা কত অসাধ্য তা আমরা সবাই কল্পনা করতে পারি।কিন্তু মিসরের মরুভূমির বালুর উপর দিয়ে এত বড় পাথর টেনে আনা কত অসাধ্য তা আমাদের কল্পনার বাইরে।

কেউ কখনো বালির উপর দিয়ে সাইকেল চালাতে গেলেই দেখা যায়, বালি কিভাবে তার উপর দিয়ে চলমান বস্তুকে টেনে ধরে। তখনকার সময়ে মিসরে এমন কোন প্রযুক্তি ছিল না, যার দ্বারা তারা এ বিশাল বিশাল স্থাপনাগুলো তৈরি করতে পারে। আর এ কারণেই এখনো অপার রহস্যের নাম পিরামিড।

মিসরের পিরামিডই হলো সবচেয়ে বিস্ময় জাগানিয়া স্থাপত্যগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু শুধু মিসর নয় বরং পৃথিবীর আরো নানা স্থানে রয়েছে আরো অনেক পিরামিড।ঠিক কি কারণে এবং কোন যান্ত্রিক সুবিধা ছাড়াই কিভাবে নির্মিত হয়েছিল এই পিরামিডগুলো? জানি, এ রকম নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করেছে আপনার মনে- কিন্তু হয়তো জানা হয়নি তেমন কিছুই।

খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬০ সালে ফারাও রাজা খুফু নিজে এ পিরামিডটি তৈরি করেন।এই পিরামিড নিয়ে কয়েকটি মজার ব্যাপার রয়েছে।চার হাজার চারশত বছর ধরে এটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য কর্ম।১৮৮৯ এ আইফেল টাওয়ার নির্মাণের পর এটি তার গৌরব হারায়।খুফুর পিরামিডের পাথরের গায়ে মূল্যবান লাইমস্টোন প্লাস্টার করা ছিল।পরে অন্য পিরামিডগুলো নির্মাণের সময়ে অন্য রাজারা এখান থেকে লাইমস্টোন নিয়ে নিজের সমাধীসৌধে লাগাতে শুরু করে।এই পিরামিডটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে।আর এই কক্ষগুলোতে ঢোকার জন্য পেরোতে হতো অনেকগুলো গোলক ধাঁধা। ইতিহাসের জনক হেরোডেটাসের মতে, এই পিরামিড তৈরিতে ১ লাখ লোকের ২০ বছর লেগেছিলো।

একটা সময়ে খুফুর পিরামিডের শীর্ষে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও, এখন আর সেখানে যেতে দেয়া হয় না।কেননা পর্যটকের এবং পিরামিড দুটোরই ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে এতে।খুফুর পিরামিড সম্পর্কে বলে গেছেন দার্শনিক হেরোডেটাস। কিন্তু তিনি যে মতবাদ দিয়ে গেছেন তা পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়।কেননা আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানাচ্ছেন, খুফু এ পিরামিডটি তৈরিতে মূলত নীলনদের তীরবর্তী মানুষদের কাজে লাগিয়েছিলেন।সময় ২০ বছরের চেয়ে অনেক কম লেগেছিলো।

এখানে ক্লিক করুন, লাইক দিন, প্রবাসের সব খবর পৌঁছে যাবে আপনার কাছে

মিশরের প্রজারা তাদের ফেরো বা ফারাওদের দেবতাজ্ঞানে পূজা করতো। রাজা-বাদশাদের মধ্যে একটি জিনিস লক্ষ্য করা যায় যে, তারা ক্ষমতায় গেলেই তাদের মধ্যে বিচিত্র খেয়াল এবং খায়েশ তৈরি হয়। মিশরের ফারাওদের তেমনই ইচ্ছে ছিল- তাদের নশ্বর দেহ যেন মৃত্যু পরবর্তী সময়ে অবিনশ্বর থাকে। এ ব্যাপারে তারা এক আশ্চর্য পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলো, যে পদ্ধতির মাধ্যমে মৃতদেহকে অনেকদিন অবিকৃত অবস্থায় করে রাখা যায় । এভাবে অবিকৃত অবস্থায় করে রাখাকে বলা হত মমি বা মামী। পিরামিড নামক উঁচু যে বস্তুগুলোর মধ্যে মমি রাখা হতো সেই পিরামিডগুলো তৈরী করার আগ থেকেই মিশরিয়ানরা মমি তৈরি করা জানতো।

  • আবু সাঈদ মাহমুদ, কায়রো, মিশর।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.