লিবিয়া

অপহরণকারীদের নির্যাতনে লিবিয়ায় দুই বাংলাদেশীর একজনের মৃত্যু, আরেকজনের জীবন সঙ্কটাপন্ন

শেয়ার করুন

লিবিয়া থেকে দেশে ফিরতে গিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই মুক্তিপণের দাবীতে অপহরণের শিকার ২ বাংলাদেশীর একজনকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। অপরজন প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুত্বর আহত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে লিবিয়ার হাসপাতালে। অপহরণকারীদের নির্মম নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে টিপু (৩০) নামের এক প্রবাসীর। সে মাগুরা জেলার শালিখা থানার শতখালী ইউনিয়নের দেউডাঙ্গা গ্রামের মকবুল বিশ্বাসের ছেলে। অপরদিকে একই সাথে অপহরণের শিকার হয়ে মৃত্যুকুপ থেকে ফিরে আসা রংপুরের মিঠাপুকুরের আব্দুল আউয়ালের ছেলে আ্ইয়ুব আলী (৩৫) লিবিয়ার একটি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে । গত ৬ ফেব্রুয়ারী দুপুরে লিবিয়ার হাসসা থেকে ত্রিপলী বিমানবন্দরে যাওয়ার সময় অপহরণের শিকার হয় তারা। এরপর অপহৃত ২ জনের ছবিসহ “লিবিয়ায় অপহৃত ২ বাংলাদেশীর দেশে ফেরা হলো না” শিরোনামে প্রবাস কথায় ১২ ফেব্রুয়ারী একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। জানা যায়, লিবিয়ার হাসসা সিমাপুর নামকস্থানে রংপুর মিঠা পুকুরের আইয়ুব আলী, মাগুরার টিপু একটি বাসা ভাড়া নিয়ে চুক্তিতে টাইলসের কাজ করে আসছিল। লিবিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে তারা এক্সিট ভিসায় দেশে ফেরার জন্য ফেব্রুয়ারীর ৮ তারিখ বিমানের টিকিট বুকিং দেয়। রাস্তায় কোন ধরনের ঝামেলা হতে পারে সে চিন্তায় তারা ২ দিন আগেই লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলী এক বন্ধুর কাছে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।

সে অনুযায়ী ২ দিন আগেই একটি ভাড়া করা গাড়িতে ত্রিপলী আসছিল। কিছু দূরে আসার পর ২ জনকেই অপহরণ করে নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। লিবিয়ার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আ্ইয়ুব আলী জানায়, তারা ৪ জন একই দিনে বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। ৪ জন এক সাথে রাস্তায় বের হলে সমস্যা হতে পারে এই কথা ভেবে তারা ২ জন করে ত্রিপলী আসার সিদ্ধান্ত নেয়। ৩ জন আগেই তুফান ও অপর একজন ত্রিপলী পৌঁছে গেলেও সে তার বন্ধু টিপু ট্যাক্সিতে জাওয়াইয়া ছেড়ে যাওয়ার পর পুলিশের পোশাক পড়া সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে অন্য গাড়িতে উঠিয়ে এক নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। মূরুভূমির মধ্যে একটি ঘরে আটকে রেখে তার বন্ধুদের কাছে তাদের মুক্তিপণ ২৫ হাজার ডলার চেয়ে ফোন দিতে বলে। এত টাকা তারা দিতে পারবে না জানালে তাদের উপর অমানষিক নির্যাতন চালাতে থাকে সন্ত্রাসীরা। নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আইয়ুব বলেন-

‘নির্যাতনের মাত্রা এতোটাই ভয়ংকর ছিল যে পানি চাইলে মুখে প্রসাব করে দিতে চাইতো ঐ অমানুষেরা। এক সপ্তাহ খবার কি জিনিষ তা চোখে দেখিনি। হাত পা বেঁধে রুমের মধ্যে ফেলে রেখে মাঝে মাঝে শরীরে কারেণ্ট শক দিতো আর মুহুর্তের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম আমরা। এভাবে ক’দিন কেটে গেছে তা বলতে পারবো না। তাদের নির্যাতনে চোখের সামনে আমার বন্ধু টিপুর মৃত্যু হয়েছে।’

মৃত্যুর পর লাশটি কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে দড়ি দিয়ে বেধে দিতে বলে অপহরণকারীরা। এ সময় নির্যাতনের শিকার আইয়ুব আলী উঠে বসতে না পারায় তার উপর আবার শুরু হয় নির্যাতন। কথাটি বলতে বলতে ওপাশ থেকে আর আইয়ুব আলীর কথা শোনা যায় না। হাসপাতাল থেকে তার এক বন্ধু বলেন-

‘আইয়ুব আর কথা বলতে পারছে না। সে যেন বোবা হয়ে গেছে। শুধু দু’চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। আর ডাক্তার তাকে কথা বলতেও নিষেধ করেছে।’

আইয়ুবের বন্ধুরা জানান, তাকে আর টিপুকে অপহরণের পর তাদের কাছে ২৫ হাজার ডলার দাবী করে অপহরণকারীরা। শেষমেষ ২৫ হাজার দিনারে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। কিন্তু এতগুলো দিনারই কোথায় পাবে তারা। বিষয়টি তাদের পরিবারে জানালে সহায়সম্বল বিক্রি করে হলেও পরিবার থেকে টাকা দিতে রাজি হয়। কিন্তু মুক্তিপণের টাকা পৌঁছে দেয়ার ঝুঁকি কেউ নিতে চায় না। এ ছাড়া হঠাৎ করে অপহরণকারীদের কন্ট্রাক্ট নম্বর বন্ধ হয়ে থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ। ঘটনার ২ সপ্তাহ পরে কে বা কাহারা আ্ইয়ুবকে মরুভূমির বালির মধ্যে থেকে অচেতন অবস্থায় এনে হাসপাতালে রেখে গেছে। এরপর থেকে লিবিয়ার আল জাওয়াইয়া হাসপাতালে আই সি ইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার জ্ঞান ফিরলেও মাঝে মাঝে সে এখনো জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন এবং তার একটি হাত কেটে ফেলা হতে পারে বলেও ধারণা করছেন চিকিৎসকরা।

  • অর্পন মাহমুদ।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.