অভিবাসন লিবিয়া

লিবিয়া থেকে স্বপ্নের ইউরোপ, মাঝখানে মৃত্যুকূপ ভূমধ্যসাগর

আগের পর্বের পর…

বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পৌঁছানো পর্যন্ত নানা বিপদ কাটিয়ে ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর মানুষগুলো এক সময় যে নিশ্চিত মৃত্যুকূপের দিকে স্বেচ্ছায় এগিয়ে যায়, সেই মৃত্যুকূপের নামই লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর ! এই সাগর দিয়ে কয়েক দশক ধরেই অভিবাসীরা বিপজ্জনকভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া–সিরিয়া সঙ্কটের কারণে এভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে যাওয়ার ঘটনা কয়েক গুণ বেড়েছে। এতে নৌকা ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে বিগত বছরগুলোর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। পারাপারের জন্য মৌসুমের তোয়াক্কা না করে সব সময়ই নৌকায় মানব পাচার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ায় দিন দিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

‘লিবিয়া টু ইতালী’ অবৈধ অভিবাসীদের জন্য এখন যেন একটি প্রতিষ্ঠিত নৌ-রুট হয়ে গেছে।গত বছর ভূমধ্যসাগর থেকে, বিশেষ করে অভিবাসী পারাপারের রুট থেকে ৩৭৭১ অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।সেখানে প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার অভিবাসী সাগরপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঢুকেছে। উন্নত জীবন-জীবিকার আশায় সাগরপথে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে পাড়ি দিতেই প্রাণ হারায় ঐসব অভিবাসীরা। আর যাদের মৃত্যুর পর লাশ মেলে কিংবা পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়, কেবল তাদের নামই হিসাবের খাতায় উঠে আসে।বাকিদের সলিল সমাধি ঘটলেও ঐ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হওয়া হতভাগ্যের লাশের পরিবার জানতেও পারে না তাদের কপালে কি জুটেছে।বিশেষ করে বছরের জুনের শেষ থেকে আগষ্ট পর্যন্ত ৩ মাস এ ব্যবসা চলে জমজমাট।আর ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর মানুষেরা এই সময়ের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে।

এ সময়ে সাগর কিছুটা শান্ত থাকায় বিভিন্ন আকারের ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে করে শত শত মাইল সাগর পথ পাড়ি দিয়ে দূরের ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।লিবিয়ার রয়েছে ১৭৭০ কিলোমিটার সমুদ্রসীমা।লিবিয়ার উপকূল থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরেই ইতালীর ল্যাম্পেদুসা দ্বীপ।সেই কয়েক দশক আগে থেকেই আফ্রিকার শত শত অভিবাসী লিবিয়া হয়ে এই ল্যাম্পেদুসায় অবতরণ করে আসছে, গল্পে গল্পে এমনটিই শুনেছি লিবিয়ানদের মুখে।২০১১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই লিবিয়ায় এই মানবপাচার ব্যবসা আরও জমজমাট হয়ে উঠেছে।এই জমমাট ব্যবসায় লিবিয়ানদের সাথে ইদানিং শামিল হয়েছে অসংখ্য বাংলাদেশী।এ কারণে এখন আর মৌসুমের তোয়াক্কা না করে দালালদের প্রলোভনে সারা বছর হাজার হাজার বাংলাদেশী চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আবার লিবিয়া উপকূল থেকে ছেড়ে যাওয়া এ সময়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবির ঘটনায় শত শত অভিবাসীর মৃত্যুর খবরও নতুন নয়। এমন ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটে চলেছে এবং প্রায়ই লিবিয়া উপকুল থেকে দু-একটি লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটলেও, তা কখনো কোন মিডিয়াতেও এখন আর প্রচার হয় না।যখন বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটে কয়েক’শ লোকের প্রাণহানি ঘটে, তখন ফলাও করে প্রচার করা হয়।কেননা, গত বছর একের পর এক অনেক লাশ উদ্ধার হয় লিবিয়ার উপকূল থেকে। সেগুলো দিনের পর দিন উপকূল এলাকা বিশেষ করে সাব্রাতা, জোয়ারা, জাওয়াইয়া, সুরমান এলাকায় হাসপাতালে পড়ে থাকে। পরে সে লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে লিবিয়াতে দাফন করা হয়। সে লাশগুলোর মধ্যে বেশ কিছু মহিলাসহ শিশুদের লাশও ছিল। তবে কিছু লাশ এতটাই বিভৎস ছিল যে, চেনার কোন উপায় ছিল না।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। নাকে রুমাল চেপে নিজ চোখে দেখেছি উদ্ধার হওয়া ঐসব হতভাগ্যের বিভৎস লাশ।তবে বোট থেকে কোষ্টগার্টের হাতে জীবিত আটক বা উদ্ধার হওয়া যত বাংলাদেশীর সাথে আলাপ হয়েছে তারা সবাই লিবিয়ার নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা’র কথা জানিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে এমনটি জানিয়েছেন।পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার বাংলাদেশীকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। এখনও দেশতে প্রায় ২৫-৩০ হাজার বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন।কিন্তু যারা এখন সেখানে অবস্থান করছে তারা যে ভালো নেই, এ কথা জানে ক’জন? টিলিবিয়ার পরিস্থিতি দিন দিন আরো ভয়ানক হচ্ছে।অনেকে দেশে ফিরতে গিয়ে অপহরণের শিকার হয়ে মুক্তিপণ দেয়ার পর দেশে ফেরার চিন্তা ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথ বেছে নিচ্ছে।তবে এমন ঘটনার শিকার হাতে গোনা কিছু বাংলাদেশী ছাড়া প্রায় অধিকাংশই ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ সাগরে নামছে।

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের মৃত্যুর কারণ:-

(১) যাত্রীদের বেশী চাপ হলে পাচারকারীরা যখন বোট যোগাড় করতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরনো বোটগুলোকে মেরামত করে রং করে সেগুলোকে মানব পাচারে ব্যবহার করতে শুরু করে।এ কারণে বেশি সময় সাগরে ভাসলে ঐ বোটগুলো পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। কখনো কখনো প্রবাল বাতাসে বোট ভেঙ্গেও মৃত্যুর কারণ হয়ে যায়।

(২) ছোট ছোট বোটে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলার কারণেও দূর্ঘটনা ঘটে।বোটগুলো কিছু দূরে যাওয়ার পর নৌকাটি যখন ভিজে একদিকে কিছুটা ভারি হয় তখন অধিক যাত্রীর কারণে নৌকা ডুবে প্রাণহানি ঘটে।

(৩) হাওয়ায় বোট- এ সময়ের ইউরোপের যাত্রীদের কাছে খুব পরিচিত একটা নাম, যা হাওয়া দিয়ে ফুলিয়ে সাগরে ছাড়া হয়। যখন অধিক যাত্রী হয় তখন হাওয়ার বোটে যাত্রীদের এক রকম জোরপূর্বক উঠিয়ে সেই বোট ছেড়ে দেয়া হয়।সাগরের প্রবল বাতাসের কারণে বোটগুলো কখনো কখনো উল্টে যাত্রীদের প্রাণহানি ঘটে।আবার কখনো কোন কারণে ফুটো হয়ে পানিতে ডুবেও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

(৪) উদ্ধারের সময় প্রাণহানির আশংকা বেশি থাকে। প্রায় লক্ষ্যে পৌঁছে যখন সাগরে কোন উদ্ধারকারীর বোট দূর থেকে দেখা যায়, তখন যাত্রীরা চিৎকার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ঐ বোটে থাকা যাত্রীরা সবাই উদ্ধারকারীর দিকে ঝুঁকতে থাকে।এ কারণে নৌকার এক দিকে লোকগুলো চলে আসায় নৌকাটি হেলে ডুবে যায়।এ সময় কিছু উদ্ধার হয় আর কিছু নিখোঁজ হয়। এসব ঘটনার কিছু ভিডিও ফুটেজও প্রচার করে উদ্ধারকর্মীরা।

(৫) অনেক সময় বড় নৌকায় যাত্রী নিয়ে কিছু দূরে যাওয়ার পর নৌকা সাগরের মাঝে থামিয়ে ছোট নৌকায় করে আরো যাত্রী নিয়ে মাঝ সাগরেই যাত্রীদের ঐ বড় বোটে ঠাসাঠাসি করে উঠানো হয়। কখনোবা অপরাধীচক্র যাত্রীদের বন্দুকের মুখে নৌকায় উঠাতে যায়। তখন ভয়ে হুড়োহুরি করে যাত্রীরা উঠতে গেলে নৌকা একদিকে হেলে গিয়ে ডুবে যায়।এতেও প্রাণহানি ঘটে।আর এ ধরণের ঘটনার শিকার হতভাগ্যদের লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।এ ছাড়া ঐ ঘটনার সময় আশপাশে পাচারকারীর কোন বোট থাকলেও তারা উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসে না।কারণ ঘটনার শিকার সব যাত্রীরা প্রাণ বাঁচাতে ঐ বোটে উঠার চেষ্টা করে এবং অধিক যাত্রীর কারণে সে বোটও ডুবে যেতে পারে- এ আশংকায় অন্যান্য বোট আরো দ্রুত দূরে সরে যায়।

(৬) আরেকটি কারণ আছে, যা প্রায় অধিকাংশ বোটেই ঘটে থাকে।অধিক যাত্রীর কারণে কিছু বোটকে দুই তলা তৈরি করে নিচ তলায় কিছু যাত্রী দিয়ে বাহির থেকে তালা বন্ধ করে দেয়া হয়।বোট লক্ষ্যে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত দেখা যায় নিচ তলায় ইঞ্জিনের কাছে থাকা কিছু যাত্রী প্রচন্ড গরমে মারা যায়। সম্প্রতি কুমিল্লার শাহাদত ও নাটোরের রইচ উদ্দিনসহ কয়েকজনের মৃত্যু হলে বোটের ভেতর থেকে সে লাশ উদ্ধার করে ইতালীর কোষ্টগার্ট। তাদের লাশ এখনো পৌঁছেনি পরিবারের কাছে।

বর্তমানে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার প্রধান পথ হচ্ছে লিবিয়া। তথ্য সূত্রে পাওয়া, গত তিন বছরে কমপক্ষে ১৫০,০০০ জন মানুষ এই পথে ইউরোপে পাড়ি দিয়েছে।এই বছরে এ পর্যন্ত ২৬,৮৮৬ জন সীমানা পাড়ি দিয়ে ইতালী গেছে, যা ২০১৬ সালের এই সময়ের চেয়ে ৭০০০ জন বেশি।এদের মধ্যে ৬০০ জনেরও বেশি যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।আর কতজন যে পৌঁছানোর আগেই রাতের আঁধারে সাগরে ডুবে নিখোঁজ হয়েছে তার হিসাব নেই।

এখানে ক্লিক করুন, লাইক দিন, প্রবাসের সব খবর পৌঁছে যাবে আপনার কাছে

সত্যি আশ্চর্যের বিষয়! অবৈধভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করছে অথচ তাদের প্রকৃত হিসাবও পাওয়া যাচ্ছে না।এমন মৃত্যু কারো কাম্য নয়। আর লিবিয়া থেকেই এমন মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে।নিশ্চিত বিপদ জানা সত্ত্বেও অনেকে স্ত্রী, সন্তান, পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন।তাদের সামনে স্বপ্নের দেশ ইউরোপে পাড়ি দেয়ার হাতছানি। এ প্রবণতাই যে কি ভয়াবহ সর্বনাশ ডেকে আনছে তা তারা প্রথমে বুঝতে পারে না। যখন বুঝে তখন তাদের দরজায় মৃত্যু নামক দানব কড়া নাড়ে।আবার অনেকেই আছেন যাদের পরিবার ঐ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে সম্মতি দেয় না বা পরিবারকে না জানিয়েই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণহানি হয়। তাদের পরিবারও জানতে পারে না তার কপালে কি জুটেছে ! আর যারা জানতে পারে, তারা লাশ না পেয়ে সারা জীবনের জন্য নীরব কান্না ছাড়া কিছুই করার থাকে না !!

আগের পর্ব: ইউরোপের স্বপ্নে লিবিয়ায়; তারপর দালালদের পুলিশ-পুলিশ খেলার খপ্পরে

  • অর্পণ মাহমুদ, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।

২ Replies to “লিবিয়া থেকে স্বপ্নের ইউরোপ, মাঝখানে মৃত্যুকূপ ভূমধ্যসাগর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.