অভিবাসন ইতালী প্রবাস আইন

ইতালীর নতুন আইন ও আমার কিছু কথা

সম্প্রতি প্রবাস কথা’র ফেসবুক পেজে ইতালীর নতুন আইন নিয়ে সুন্দর একটা লাইভ অনুষ্ঠান দেখলাম। সরাসরি লাইভ দেখতে পারি নি, একজনের শেয়ার করা ভিডিওটা দেখেছি। খুব ভালো লেগেছে।ঐ অনুষ্ঠান থেকে অনেক কিছু জানলাম। ধন্যবাদ উপস্হাপক এবং গেস্টকে ৷

ভিডিও দেখার পর কেনো জানি খুব মন খারাপ হয়েছিল। মনে হয়েছিলো, আমি একজন বিদেশি তাই আমাকে নিয়ে তাদের নতুন আইন প্রণয়ন। অর্থাৎ আমরা বিদেশিরা এখন তাদের টার্গেট এবং আমাদেরকে তারা বোঝা মনে করছেন! আমরা ইতালীর বোঝা দেশেরও বোঝা!

অবশ্য নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে যদি ভাবি তাহলে দেখবো আজকের এই বিদেশি বিদ্বেষভাবটার জন্য কিন্তু আমরাও অনেকটা দায়ী। আমি এর আগেও আমার বিভিন্ন লেখায় আমাদের দোষ গুলি নিয়ে লিখেছিলাম। আমরা একটা দেশে থাকি সে হিসাবে তাদের প্রতি আমাদের রেসপেক্ট থাকা উচিত। অথচ আমরা দেশের মতোই এখানেও সব ক্ষেত্রেই বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর চেষ্টা করি। ঐ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জানলাম ড্রাগ বিজনেসের কথা, একজন টুরিস্ট মহিলাকে রেপ করার বিষয়টা!! আমরা আর কতটা নীচে নামবো!! একটা দেশে আমরা সুন্দর ভাবে থাকতে পারছি।কাজ করতে পারছি। দেশে বিদেশে পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারছি এটাই কি অনেক না?

লিটন ভাইয়ের প্রতিটি কথা সত্যি ছিলো।অনেকেই আছেন শুধু টাকা কামাই করতে শিখেছেন কিন্তু অল্প খরচেও কত সুন্দর ভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে চলা ফেরা করা যায় এরা তা বুঝেও বুঝেন না। আমাদের রান্না আর খাবারের একটা আলাদা গন্ধ আছে যা ইতালীয়ানরা পছন্দ করেন না।বিশেষ করে কাপড়চোপড় থেকে যে গন্ধ বের হয় এটা খুবই উৎকট। একজন বাঙ্গালী হয়ে আমি নিজেও সহ্য করতে পারি না।এই ছোট্ট ব্যাপারটা একটু খেয়াল করলেই এড়ানো যায়। ঘরে ব্যাবহার করা কাপড় পরে বাহিরে না যাওয়াই ভালো। প্রতিদিন এক বা দুইবার যদি বাসার জানালা গুলি কিছুক্ষন খুলে রাখা যায় তাতেও এই বোটকা গন্ধটা এড়ানো সম্ভব।

আমার বাসার সিড়ি দিয়ে নামার সময় আমরা নাক চেপে ধরে নামি, চেষ্টা করি লিফ্ট ব্যাবহার করতে। এটার মুল কারন হল – শীতের সময়ে একটা বাসার দরজা জানালা যদি কখনওই না খোলা হয় তাহলে গন্ধটা কেমন হবে? বাসার দরজার নীচ দিয়ে গন্ধ চলে এসে এমন অবস্হা হয় রীতিমতো বমি আসে। একজন ইতালীয়ান প্রতিদিন কেন এই অত্যাচার সহ্য করবেন?

আমার ফ্ল্যাটের রান্না ঘরের সাইড বরাবর নীচে প্রায়ই একজন চিৎকার করে দেশে বউয়ের সাথে কথা বলেন। মাঝে মাঝে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে ঝগড়া শুরু করেন!! উপরে রান্না ঘরে থেকে আমার মন চায় ওনারে বলি – ভাই আল্লারওয়াস্তে আস্তে কথা বলেন। একজন বাঙ্গালী হিসাবে আমার সত্যিই লজ্জা লাগে। তো আশেপাশের মানুষদের ধারনা কেমন হবে?

অসততার কথা আর কি বলবো! আমি সব সময় বলি আমরা মুলা তোলা খাওয়া পাবলিক।আমার আশেপাশের শহর গুলিতে বাঙ্গালীরা বাসা ভাড়া পাচ্ছে না। এর কারন হলো বেশির ভাগই বাসা ভাড়া ঠিকমতো দেয় না।বছরের পর বছর বাসা ভাড়া না দিলে বাড়িওয়ালা কেন তার বাসাটা আমাকে ভাড়া দিবে? এখন বাড়ির মালিকরা এজেন্সি গুলিকে আগেই বলে দিয়েছে বাঙ্গালী হলে তারা বাড়ি ভাড়া দিবে না। অনেকেই ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি কিনে প্রতি মাসের ব্যাংকের ইনস্টল দিচ্ছেন না! মাগনা থেকে এই টাকা জমিয়ে তিনি দেশে বাড়ি করছেন! ইনফিউচারে দেখা যাবে ব্যাংক আমাদের লোনই দিবে না। এটা কি ঠিক?

যে কোন কাজ করার আগে আমাদের ভাবা উচিত আমরা কি করছি। ইনফিউচারে এটার রেজাল্ট কি? সেই রেজাল্টের খেশারত কারা দিবে? এই উল্টাপাল্টা কাজের খেসারত দিবে আপনার আমার সন্তানরা যারা এ দেশে থেকে যাবে।এজন্য যেকোন কাজ করার আগে নুন্যতম ভাবা উচিত।আমার ভুলের বা অন্যায়ের খেসারত যেনো আমাদের সন্তানদের না দিতে হয়।

আমার ছেলেটাকে রাতেই বোঝালাম- বাপ তুমি কারও সাথে মারামারি করতে যেও না।চেষ্টা করবে মাথা ঠান্ডা রাখতে।ও কিছুটা বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল – নিজেকে প্রটেক্ট করতেও না? একজন আমাকে শুধু শুধু গায়ে পরে ঝগড়া বাঁধিয়ে মারামারি করতে আসবে আর আমি চুপ করে দাড়িয়ে থাকবো?এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমি দিতে পারি নি। সত্যি কথা বলতে রেসিজমের কারনে আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আমি কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে কোন দেশের সরকার যদি বিদেশি বিদ্বেষী হয় তা সে দেশের জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে পরতে বাধ্য।

এবার বেশ কিছু ইতালীয়ানরা আমাকে প্রশ্ন করেছে আমার আশেপাশে রাসিস্ট টাইপের লোক আছে কিনা? তাদের নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন কিনা? উত্তরে এইটুকু বলেছি আমি ভালো ইতালীয়ান বেশি পেয়েছি। সত্যিকার অর্থে ইতালীয়ানদের মধ্যে ভালো মানুষই বেশি।তবে ওরা সত্যি সত্যিই আমাদেরকে দেখে জেলাস ফীল করে। ওদের কথা হল আমরা ওদের কাজে ভাগ বসাচ্ছি। ওদের পয়সা আমাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছি।

যাক লেখা অনেক লম্বা করে ফেললাম।আমরা যারা ইতালীতে আছি আমরা আমাদের স্বার্থেই এই দেশের আইনকে রেসপেক্ট করে সুন্দর, শান্তিপুর্ন ভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করি। বাঙ্গালী হিসাবে আমরা সব সময় মনে রাখি, আমি আমার দেশের একজন প্রতিনিধি। প্রতিটা মুহুর্তে আমি আমার দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি।

লেখিকা-পান্না চৌধুরী,ইতালী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.