রিফিউজি হিসেবেও তাকে গ্রহণ করেনি ইতালী সরকার

২৯ ডিসেম্বর বৃহঃ, ২০১৬

মতামত: ১ টি

বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া, লিবিয়া থেকে ইতালী। অভিবাসী হওয়ার পথে এক যুবকের নিরন্তর জীবন সংগ্রামের সত্য ঘটনা উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। এই ঘটনার মূল চরিত্র তার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে চায় না, তাই প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি।

ছেলেটির বাড়ি বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় প্রবণ এলাকায়। মাঝে মাঝে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে লন্ডভন্ড করে দেয় তাদের সবকিছু। ২০০৪ সালে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে এইচএসসি পাশ করার পর, অনেক কষ্ট করেই ২০০৮ সালে বিবিএ-তে ভর্তি হতে হলো তাকে। কারণ উচ্চশিক্ষার পথে স্বাচ্ছন্দ্যে এগিয়ে যাওয়ার মতো পারিবারিক স্বচ্ছলতা ছিল না তার পরিবারের। কিন্তু বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন তার। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি মৎস্য চাষের একটা কোর্স করলো সে এবং নিজেদের পুকুরে মাছের প্রকল্পও শুরু করলো। কিন্তু নিয়তি ভিন্ন পরিকল্পনা করে রেখেছিল। ঘূর্ণিঝড় এসে ভেঙ্গে দিয়ে গেলো তাদের বাড়িঘর। মাছের প্রকল্পও ভেসে গেলো। তার স্বপ্ন যেন একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো, বন্ধ হয়ে গেলো পড়ালেখা।

রাস্তার পাশে একটা খাস জায়গায় বসবাস করতে লাগলো পরিবারটি। এক বন্ধু এবার পাশে দাঁড়ালো। তাকে শহরে নিয়ে গিয়ে টিউশনির ব্যবস্থা করে দিলো। সেই উপার্জনে সে নিজের থাকা-খাওয়া আর পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু ছেলেটার সংগ্রাম শুধু তার নিজের জন্য ছিল না, ছিল তার পরিবারের জন্যও। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সে দিনের বেলা নিজের পড়াশোনা, টিউশনি আর রাতের বেলা রিক্সা চালানো শুরু করলো। ২০১২ সালে বিবিএ পাশ করলো সে। এরপর পুলিশে চাকরির আবেদন করলো। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় টিকে যাওয়ার পর আবার পথ বন্ধ হয়ে গেলো। চাকরিটা পেতে হলে ১৫ লাখ টাকা লাগবে। যে ছেলেটি টিউশনি করে বিবিএ করলো আর রিক্সা চালিয়ে সংসার চালালো, সে ১৫ লাখ টাকা কোথায় পাবে! বিপদ আসলে নাকি সব দিক থেকেই আসে। তার ক্ষেত্রেও এমনটাই হলো। একদিকে চাকরি হয়ে গেলো সোনার হরিণ, অন্যদিকে গ্রামে যে জায়গায় তারা নতুন ঘর তুলেছিল সেই জায়গা থেকেও উচ্ছেদ হতে হলো।

এ পর্যায়ে তার গ্রামেরই এক লোক তাকে বললো, লিবিয়ায় একটা চাকরির ভিসা আছে। চাইলে সে সুযোগটা নিতে পারবে। তবে ভিসার দাম সাড়ে ৫ লাখ টাকা। টাকাটা সে তার গ্রামের মাতবরের কাছ থেকে সুদের উপর নিলো। দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হলো যে, ছেলেটি বিদেশে যাওয়ার পর থেকে প্রতি মাসে ১৭ হাজার টাকা করে দিতে হবে। সব শর্তে রাজি হয়ে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়লো।

তার জীবন সংগ্রামের যেন কোন শেষ নেই। লিবিয়ায় পৌঁছার পর সে জানতে পারলো, তার ভিসাটা ভুয়া ছিল। একজন বাংলাদেশী তাকে জানালো, সে যে কোম্পানীর কাজের জন্য ভিসা নিয়েছে সেই কোম্পানীই নেই। মাথায় যেন এবার আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সুদের উপর যে সাড়ে ৫ লাখ টাকা নিয়ে লিবিয়ায় এসেছে তার কিস্তি সে দেবে কিভাবে! বিমানবন্দর থেকে ঐ বাংলাদেশী তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেলো যেখানে এই ছেলেটির মতো আরো প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন আগে থেকেই ছিল। প্রায় ২০ দিন ধরে তারা সেখানে। এই ২০ দিনে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চলেছে। খাওয়া দিনে একবার দিলেও সেটা শুকনো রুটি যা গলা দিয়ে নামে না। বাংলাদেশ থেকে ভুয়া ভিসার মাধ্যমে লিবিয়ায় মানুষকে নিয়ে আটকে রেখে অত্যাচারের মাধ্যমে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে লিবিয়ার এই চক্র।

কয়েকদিনের মধ্যে চক্রটি বুঝতে পারে এই ছেলেটির কাছে তাদেরকে দেয়ার মতো কিছু নেই। তাই তাকে ছেড়ে দেয় তারা। এবার সে কোথায় যাবে? জায়গা চেনা নেই, পরিচিত কেউ নেই, ভাষা জানা নেই। উদ্দেশ্যহীন হাঁটা শুরু করলো সে। রাস্তায় এক বাংলাদেশীর সাথে দেখা হলো। তার কাছেই সবকিছু খুলে বললো সে। ঐ বাংলাদেশী তাকে জানালো, এখানে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে হলেও জীবন হাতে নিয়েই করতে হয়। তারপর ছেলেটিকে সাথে নিয়ে লোকটি তার বাসায় গেলো। তার বাসায় থেকে ছেলেটি শুধু টিকে থাকার জন্য যখন যে কাজ পেয়েছে সেটাই করেছে। কখনো রাজমিস্ত্রী, কখনো হেল্পার, কখনো রংমিস্ত্রী।

এখানে ক্লিক করুন, প্রবাস কথার সাথে থাকুন

এভাবে কয়েক মাস চললো। কিন্তু পরিশ্রমের মূল্য সঠিকভাবে পায় না সে। কাজের সঠিক মূল্য চাইলেই লিবিয়ানদের মারধোরের শিকার হতে হয়। এবার ছেলেটি এক নতুন স্বপ্ন দেখলো। সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালী যাবে সে। ইতালী যাবার জন্য বাংলাদেশী দালালকে ১২০০ দিনার দিতে হবে। যেভাবেই হোক লিবিয়ার এই দু:সহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে হবে। ছেলেটি দিন-রাত কাজ করে ১২০০ দিনার উপার্জন করলো এবং ইউরোপে যাওয়ার জন্য দালালের হাতে তুলে দিলো।   

২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল। জীবন বাজি রেখে লিবিয়া থেকে একটা ডিঙ্গি নৌকায় করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ছেলেটি। যে নৌকায় ২০ জন পর্যন্ত উঠতে পারে সেখানে ১০০ জনকে উঠানো হয়েছে। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ আর নানান প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে বেঁচে থেকে যদি ইউরোপে পৌঁছাতে পারে তাহলে তার স্বপ্ন পূরণ হবে। সমুদ্রে ভাসমান নৌকা থেকে মানবতার খাতিরেই একটা সময় আরো অনেকের সাথে ঐ ছেলেটিকেও জাহাজে তুলে নিলো ইতালীয়ান পুলিশ। ইউরোপের মাটিত পা রাখলো ছেলেটি। কিন্তু স্বপ্ন কি পূরণ হলো? পুলিশ প্রথমে তাদের পরিচয় জানলো, বিভিন্ন দলে ভাগ করলো। ছেলেটিকে বাংলাদেশীদের দলে দেয়া হলো। ৩ দিন ইতালীর সিসিলিতে রাখার পর পাঠানো হলো মিলানে। 

মিলানে তাকে অন্য বাংলাদেশীদের সাথে একটা বাসায় থাকার এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। ইউরোপিয়ান কমিশনের আইন অনুযায়ী ইতালীতে তার থাকা-খাওয়া ফ্রি হয়ে গেলো এবং হাত খরচের জন্য মাসে ৭৫ ইউরো করে পেতে শুরু করলো সে। আরও ৯ মাস পর তাকে ডেকে তার রিফিউজি হওয়ার কারণ জানতে চাইলো প্রশাসন। কিন্তু সে যেসব কারণ দেখালো তাতে হয়নি তারা। অর্থাৎ রিফিউজি হিসেবে তাকে গ্রহণ করেনি ইতালী সরকার। সরকারি খরচেই তাকে উকিল দেয়া হয়েছে আপিল করার জন্য। সে আপিল করেছে। এখন তার পরিণতি কি হবে তা নির্ভর করছে ভাগ্যের উপর।

  • ফাতেমা আলী, মিলান, ইতালী।


  1. jahangir says:

    সত্যিই খুবই বেদনা দায়ক …… যাক উনি যদি কোন ক্রাইমের সাতে জড়িত না হয়ে ঠিক ভাবে চলা পিরা করেন, তাহলে একদিন না একদিন লিগাল হয়ে থাকতে পারবেন …… আমি উনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি ……

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!