না জানি বৃদ্ধার অারও কত কি বলার ছিল!

৩১ ডিসেম্বর শনি, ২০১৬

মতামত নেই

অামার এ্যাপার্টমেন্ট এর ফার্স্ট ফ্লোরে একজন বয়স্ক স্প্যানিশ ভদ্রমহিলা থাকেন৷ বাসায় উঠতে নামতে প্রায়ই উনার সাথে অামার কথা হয়৷ খুব বেশি কথা যে হয় এমন নয়৷ বড়জোর সালাম ও শুভেচ্ছা- এর বেশী নয়৷ মাঝে মধ্যে অামার সন্তানদের পেলে খুব অাদর করে কাছে ডাকেন ও এটা ওটা দিয়েও থাকেন৷ অামাদের সম্পর্ক ছিল এ পর্যন্তই৷ একজন ফরেন প্রতিবেশী হিসেবে যতটুকু থাকার ঠিক ততটুকুই৷

একদিন ছুটির সকাল, মর্নিং ওয়াক করে বাসায় ফিরছি৷ চারিদিকে ঝলমলে রোদ৷ এই ডিসেম্বরে যেখানে শীতের কাছে মানুষ ধরাশায়ী সেখানে অামার শহরে হাজারও পর্যটকের ভিড়৷অাকাশ ফাটিয়ে রোদের ঝলকানি পৃথিবীর নানা প্রান্তের ভ্রমণ-পিপাসুদের টেনে নিয়ে অাসে বিচিত্র এ শহরে৷ অামি বাসার গেটে পৌঁছামাত্র ভদ্র মহিলার সাথে দেখা৷ সালাম (স্প্যানিশ ভাষায়) দিয়ে কুশল বিনিময় করলাম৷ দেখলাম, একটা চেয়ার নিয়ে বাসার সামনের উঠোনটায় রৌদ্রের মাঝে বসে অাছেন৷ উনাকে দেখে কিছুটা বিমর্ষ মনে হলো৷ ভাবলাম বয়স্ক মানুষ, হতেও পারে৷ অামার ভাবনার ছেদ কেটে অামাকেই জিজ্ঞেস করে বসলেন, অামি ফ্রি কি না ? যখন বললাম- ‘হ্যাঁ, অাজ অামার ছুটি’৷ উনি খুশি হলেন৷ অামাকে অারেকটি চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন৷ বসার পর কিছু অালাপের এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম, অাপনাকে প্রায় প্রতিদিনই এখানটায় বসে থাকতে দেখি৷ অাপনার অাত্বীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে?
অামার প্রশ্ন শেষ না হতেই দেখলাম, বয়সের ভারে ভাজ হয়ে পড়া গাল বেয়ে এক ফোঁটা পানি ঝরে পড়লো৷ কি স্বচ্ছ অার চকচকে সে পানি ! এখনও অল্প একটু পানি গালের ভাজে লেগে অাছে৷ না জানি না বলা কত কষ্ট এই বৃদ্ধার গাল বেয়ে চোখ থেকে ঝরে পড়লো ?

এখানে ক্লিক করুন, প্রবাস কথার সাথে থাকুন

ভেজা ভেজা কন্ঠে অামাকে বললেন, অাপনার মত অামারও দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে অাছে৷ বলেই থেমে গেলেন৷ কন্ঠটা অারো ভারী হয়ে অাসলো উনার৷ অতি কষ্টে এভাবেই বুঝি শ্বাস-প্রশ্বাস রূদ্ধ হয়ে মানুষের কন্ঠ ভারী হয়ে ওঠে৷ অাবারও বলতে লাগলেন, অামার মেয়েটা তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকে৷ অার ছেলেগুলো তাদের গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে কোথায় থাকে, অামি নিজেও জানি না৷ ওরা অামার তেমন একটা খোঁজ নেয় না, অামিও নেই না৷ অথচ—!
অাবারও চোখ থেকে কিছু একটা ঝরে পড়তে দেখলাম৷ অামার বাচ্চাদের প্রসঙ্গ এনে বললেন, ঠিক এমন ছিল অামার সন্তানগুলোরও৷ মনে হয়, কেবল সেদিন অামি ওদের ন্যাপি বদলাচ্ছি, গোসল করাচ্ছি, স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি, পার্কে নিয়ে যাচ্ছি, মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি৷ অথচ, কত দ্রুত সময় চলে গেলো৷ এই যে দেখছেন গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে ফার্স্ট ফ্লোর পর্যন্ত সব অামার নিজের৷ অামার অারও অনেক সহায় সম্পত্তি আছে শহরের অানাচে কানাচে, তারপরও অামার কাছে মনে হয় অামি নিঃস্ব, অসহায়, কিচ্ছু নেই অামার৷
এবার থামলেন৷ বুঝতে পারলাম নিজেকে কিছুটা হলেও হালকা করতে পেরেছেন কষ্টগুলো অামার সাথে শেয়ার করে৷ অামিও অামার মতো করে শান্ত্বনা দিতে থাকলাম৷ এমন সময় অামার ফোন বেজে উঠলো৷ মা’র কল, বাংলাদেশ থেকে৷ হায়রে মা; এক মায়ের কষ্ট ও দুর্দশার গল্প যখন শুনছি তখন অারেক দুঃখী মায়ের কল৷ অামি উনার কাছে অনুমতি নিয়ে অামার মা’র কল রিসিভ করলাম৷জরুরী অালাপ, অামাকে উঠতেই হবে৷ অামি সেদিনের মত উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে অাসি৷

____________________এক সপ্তাহ পর অফিস থেকে বাসায় ফিরছি৷ বাসার কাছে যখনই অামার রোডে প্রবেশ করবো, দেখি পুলিশের ব্যারিকেড দেয়া৷ রোডের এ মাথা ও মাথা পুরোটাই বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ৷ অনেকগুলো পুলিশের গাড়ি ও এ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ফেলেছে অামার পুরো রোড৷ অামি কর্তব্যরত এক পুলিশ অফিসারকে অামার অাইডি কার্ড দেখিয়ে বললাম, অামি এখানকার বাসিন্দা৷ পুলিশ অফিসার গুরুত্বের সাথে অামাকে অামার গেট পর্যন্ত নিয়ে অাসলো৷ যে-ই গেটের সামনে অাসলাম, চোখে পড়লো গেটের সামনের উঠোনটায় পলিথিনের কাগজে মোড়ানো একটি লাশ৷ অামি জানতে চাইলাম, লাশটি কার? যখন শুনলাম সেই বৃদ্ধ মহিলা, তখন অার নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না৷ বার বার চোখের সামনে ভাসছিলো বৃদ্ধার গাল বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রু৷ এক প্রতিবেশী যখন বললেন, তিনি এ চেয়ারটায় বসা অবস্থায়ই মারা গেছেন- তখন নিজের অজান্তে কখন যে অামার চোখ থেকে ক’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো, টেরই পাইনি৷ কে জানতো- সেদিনের অালাপই যে হবে অামাদের শেষ অালাপ? না জানি বৃদ্ধার অারও কত কি বলার ছিল! কত কষ্ট শেয়ার করার ছিল !!

  • এখলাছ মিয়া, বার্সেলোনা, স্পেন।


আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!